দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে সংকট দেখা দিয়েছে। জ্বালানি ঘাটতি ও উৎপাদন খরচের চাপে প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে লোডশেডিং। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েকদিন ধরে সর্বোচ্চ লোডশেডিং তিন হাজার মেগাওয়াটের উপরে রয়েছে। সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে, তার আগের দিন যা ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, আগের সরকারের আমলে দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার ও খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলস্বরূপ, বিপুল সংখ্যক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হলেও সেগুলো থেকে পূর্ণ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। অথচ ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বিপুল অঙ্কের অর্থ গুনতে হচ্ছে পিডিবিকে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে পিডিবির পাওনা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। ভর্তুকির পরিমাণও প্রতিবছর বাড়ছে, কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ২০২২ সাল থেকেই প্রতি বছর গরমের মৌসুমে লোডশেডিং দেখা দিচ্ছে। রাজধানীর বাইরের জেলাগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তবে বৃষ্টি হলে চাহিদা কমে কিছুটা স্বস্তি মিলছে।
এলএনজি সরবরাহ হ্রাসের কারণে গ্যাস সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে, যা সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোর কার্যক্রমকেও ব্যাহত করছে। পিডিবির দায়িত্বশীল দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সুফল পেতে অন্তত দুই মাস সময় লাগবে। নতুন করে বকেয়া বাড়বে না বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন এবং পুরোনো পাওনা ধাপে ধাপে পরিশোধের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও সোমবার সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট। তখন সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি অংশই তখন অকেজো হয়ে ছিল। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন চলছে ৪ হাজার মেগাওয়াটেরও কম। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও কিছুদিন সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে, তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ালে খরচ অনেক বেড়ে যাবে, তাই সেগুলো কম চালানো হচ্ছে। রাতে কয়েক ঘণ্টা তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন হলেও বেশিরভাগ সময় গড়ে দেড় হাজার মেগাওয়াটের নিচে রয়েছে তেলচালিত কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন।
পিডিবি গতকাল বিকেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে অনলাইন বৈঠক করেছে। সূত্র জানিয়েছে, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র সন্ধ্যায় ৮০০ মেগাওয়াট সরবরাহ করছিল, যা আরও বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব নয়, তারা ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আদানির কেন্দ্রকেও উৎপাদন বাড়াতে বলা হয়েছে। আদানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১১ আগস্ট রাত থেকে ১২ আগস্ট সকালের মধ্যে কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ সংকটের কারণে উৎপাদন কমেছে। সন্ধ্যার পর লোডশেডিং সহনীয় রাখতে তেলচালিত কেন্দ্র চালানো হলেও মধ্যরাতের পর উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায় লোডশেডিং বেড়ে যায়। উৎপাদন বাড়ানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ঢাকার দুই বিতরণ সংস্থা ডেসকো ও ডিপিডিসির এলাকায় বিদ্যুৎ চাহিদার কোনো ঘাটতি নেই। তবে গ্রামীণ বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা আরইবিসহ অন্যান্য বিতরণ কোম্পানিগুলো চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে। ফেনী জেলায় ১৪০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ৩০ মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে। স্টারলাইন ফুড প্রোডাক্টের পরিচালক মো. মাইন উদ্দিন জানান, তাদের কারখানায় প্রতিদিন গড়ে ৩৫ শতাংশ সময় লোডশেডিং হচ্ছে। ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের এজিএম মোহাম্মদ বাইজিদ হোসেন শাহ জানান, পল্লী বিদ্যুতে ১৫ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে।
কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম বলেন, দিনের বেলায় তো বিদ্যুৎ থাকে-ই না, রাতেও প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ চলে গেলে বাচ্চারা ঘুম থেকে উঠে কান্নাকাটি শুরু করে। রাতে ঘুমানোর সুযোগও মিলছে না। নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বাঘবেড় গ্রামের আক্কাস আলী আকন্দ জানান, ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ৫ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পান না তারা। নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক আকরাম হোসেন বলেন, ১৫৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৫৯ মেগাওয়াট।
হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। চা-পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অপরিহার্য হওয়ায় চা-বাগানগুলো ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। চুনারুঘাটের দেউন্দি চা-বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক দেবাশীষ রায় জানান, বিদ্যুৎ না থাকলে প্রক্রিয়াজাত পাতা নষ্ট হয়ে যায়, ফলে লোকসান গুনতে হয়। ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪-এর মহাব্যবস্থাপক গোলাম কাউসার তালুকদার জানান, কেরানীগঞ্জে ২৪০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে প্রতিদিন প্রায় ৮০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে। নীলফামারী জেলা সদরের টুপামারী ইউনিয়নের দোগাছি গ্রামের সাদ্দাম আলী বলেন, প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে লোডশেডিং যুক্ত হয়ে কাজকর্ম করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ডোমার উপজেলা নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নওশাদ আলী জানান, চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, ফলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টাও গ্রাহকরা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।




