দিনাজপুরের বিরল উপজেলার বামনগাঁও গ্রামের ৩৫ একর জমিতে গড়ে ওঠা একটি সমন্বিত কৃষি খামার এখন এলাকার তরুণদের কাছে অনুপ্রেরণার কেন্দ্র। খামারটির উদ্যোক্তা মেছবাহুল ইসলাম, যিনি চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছেন। তবে চাকরির পেছনে না ছুটে তিনি বেছে নিয়েছেন কৃষিকেই। প্রায় ৩৫ একর জমির এই খামার গড়তে তাঁর কাছে নিজের কোনো মূলধন ছিল না। ‘ক্রাউড-ফান্ডিং’ বা গণ-অর্থায়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জোগাড় করেছেন এক কোটির বেশি টাকা। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে খামারটি আর্থিক সাফল্যও পেতে শুরু করেছে।
প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মোটরসাইকেলে চড়ে খামারের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়ান মেছবাহুল। কখনো পুকুরপাড়ে মাছের খামারে, কখনো নার্সারিতে, আবার কখনো ভার্মি কম্পোস্টের শেডে দেখা মেলে তাঁর। মরিচখেতেও শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করতে দেখা যায় তাঁকে। স্থানীয় বাসিন্দারাও কৃষি বিষয়ে পরামর্শ নিতে নিয়মিত তাঁর কাছে ছুটে আসেন।
মেছবাহুলের বাবা লুৎফর রহমান পেশায় শিক্ষক। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। ২০২৩ সালে চুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করার পর তিনি ‘অ্যাগ্রো টরটোইজ’ নামে একটি কৃষিসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। পৈতৃক ২০ একর জমির সঙ্গে আরও ১৫ একর জমি বর্গা নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করেন। খামারের আয় থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন অফিস ও গুদামঘর। দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে সীমান্তবর্তী এই গ্রামে খামার ঘুরে দেখা যায়, চার বিঘা জমির মরিচখেতে শ্রমিকেরা পাকা মরিচ তুলছেন। পুকুরের চারপাশে তারকাঁটার বেড়ার সঙ্গে মাচায় ঝুলছে করলা, সারিবদ্ধ পেঁপেগাছে ফল ধরেছে। নার্সারিতে টবে লিচুর চারা প্রস্তুত হচ্ছে, কলাবাগানে ঝুলছে বড় বড় কাঁদি।
বর্তমানে ১০ একর আয়তনের তিনটি পুকুরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষের পাশাপাশি প্রায় ১০ একর জমিতে কলা, পেঁপে, মরিচ, ক্যাপসিকাম, শসা, আদা, করলাসহ নানা ধরনের ফসল উৎপাদন করছেন মেছবাহুল। এছাড়াও রয়েছে দেশি জাতের আটটি গরুর খামার, হাঁস পালন, ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন এবং সুগন্ধি জাতের ধানের আবাদ। অফিসসংলগ্ন জমিতে আম, লিচু, আঙুরসহ বিভিন্ন ফল গাছের চারা উৎপাদন ও বিক্রি করা হয়। খামারে প্রতিদিন ১৫-২০ জন শ্রমিক কাজ করেন। চলতি মৌসুমে শুধু লিচু, কলা ও করলা বিক্রি করেই আয় হয়েছে ১০ লাখ টাকার বেশি। নিজের উৎপাদিত ভার্মি কম্পোস্ট খামারের জমিতে ব্যবহারের পাশাপাশি আশপাশের কৃষকদের কাছেও বিক্রি করা হচ্ছে। খামারে রয়েছে আধুনিক কৃষিযন্ত্র, পুরো এলাকা সিসিটিভির আওতায়। অফিসে বসে অনলাইনে পাওয়া ফরমায়েশ অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন স্থানে চারা পাঠানো হয়। মাঝে মাঝে ড্রোনের সাহায্যেও প্রকল্প এলাকায় নজর রাখেন তিনি।
বিরল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুম্মান আক্তার জানান, নিরাপদ সবজি ও মানসম্মত চারা উৎপাদনে কাজ করছেন মেছবাহুল। কৃষি বিভাগ থেকে তাঁকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির দুই বছরের মাথায় বিয়ে করেন মেছবাহুল। স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই ছিল ভ্রমণের নেশা। এই খরচ মেটাতে ক্যাম্পাসে শুরু করেন ঘরে তৈরি খাবারের ব্যবসা। ‘শৈলআঁখির রন্ধনশৈলী’ নামে ফেসবুক পেজ খুলে প্রচার চালান। চুয়েটের আবাসিক হল ও আশপাশের মেসে তাঁদের রান্না করা খাবারের বেশ চাহিদা তৈরি হয়। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় দিনাজপুরে ফিরে এসে ফুল-ফলের নকশায় জুয়েলারি বানানো শুরু করেন, পাশাপাশি অনলাইনে আম বিক্রি করেন। মেছবাহ জানান, দুটো ব্যবসায় এতটাই সাড়া পেয়েছিলেন যে মাত্র দুই সপ্তাহে খরচ বাদে ৪৮ হাজার টাকা লাভ করেন। এরপর খাদ্যসংকটের কথা ভেবে নিজেরাই চারা উৎপাদন করে বিভিন্ন সবজির চাষ শুরু করেন। ইউটিউবে কৃষির নানা বিষয় শিখে প্রথমবার স্কোয়াশ ও ক্যাপসিকাম চাষ করে ভালো লাভ পান। সেখান থেকেই কৃষির প্রতি আলাদা টান অনুভব করেন।
২০২৩ সালে স্নাতক শেষ করে পুরোপুরি কৃষিভিত্তিক ব্যবসায় মনোযোগ দেন। মূলধনের অভাব দূর করতে ক্রাউড ফান্ডিংয়ের ধারণা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রথম এক লাখ টাকা বিনিয়োগ পান। এরপর ধীরে ধীরে আরও অনেকে যুক্ত হন। উল্লেখ্য, অনেক মানুষের কাছ থেকে ছোট ছোট অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করে কোনো প্রকল্প, ব্যবসা বা উদ্যোগের অর্থের সংস্থান করার পদ্ধতিই গণ-অর্থায়ন। এটি কখনো দানভিত্তিক, কখনো পুরস্কারভিত্তিক, আবার কখনো বিনিয়োগভিত্তিক হয়ে থাকে।
মেছবাহুলের অ্যাগ্রো টরটোইজ খামারে বর্তমানে ৩৭ জন বিনিয়োগকারী রয়েছেন, যাদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ এক কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ইতিমধ্যে অনেকেই লভ্যাংশ পেতে শুরু করেছেন। চলতি বছর প্রায় ৮০ শতাংশ বিনিয়োগকারী তাঁদের বিনিয়োগের বিপরীতে ৪ থেকে ১৫ শতাংশ মুনাফা পেয়েছেন। মোট লভ্যাংশের পরিমাণ প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা। খামারে বিনিয়োগকারীদের একজন ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রকৌশলী তানজীর হোসেন। তিনি জানান, অ্যাগ্রো টরটোইজে পুকুর বাগান-১ এবং ভার্মি কম্পোস্ট প্রকল্পে বছরখানেক আগে চার লাখের বেশি বিনিয়োগ করেছেন এবং এবার ছোটখাটো মুনাফা পেয়েছেন। বিশ্বস্ততার জায়গা থেকেই মূলত বিনিয়োগ করার সাহস পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
মেছবাহুল জানান, খামারে বর্তমানে ভরা কলস, আদা-১, মরিচ-১, ভার্মি কম্পোস্ট, লিচু চারা-১-সহ মোট আটটি প্রকল্প চালু আছে। প্রকল্পগুলো সাধারণত ছয় মাস থেকে এক বছর মেয়াদি হয়। প্রথমে সম্ভাব্য ব্য�় নির্ধারণ করে বিনিয়োগকারী চূড়ান্ত করা হয়। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে বিভিন্ন শর্তসাপেক্ষে উভয় পক্ষের চুক্তি হয়। প্রকল্পে যা লাভ হয় তার ৫০ শতাংশ পান বিনিয়োগকারী, বাকি ৫০ শতাংশ পায় অ্যাগ্রো টরটোইজ। বিনিয়োগকারী চাইলে আবেদনের মাধ্যমে বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত পেতে পারেন, যা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হবে।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত শুরুতে পরিবার সহজভাবে নেয়নি। গ্রামবাসীর কাছ থেকেও নানা প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। তবে এখন গ্রামের অনেকের কাছে মেছবাহ অনুপ্রেরণা। গ্রামের কৃষক আইনুল ইসলাম (৫৫) জানান, ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা ছেলেটি কৃষিকাজ ও মাছ চাষ করছে দেখে অনেকেই কথা বলেছিল, কিন্তু এখন তার অফিসে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।
খামারে প্রথম দিকের বিনিয়োগকারীদের একজন মেছবাহুলের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাইমুল হক। বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এই অধ্যাপক জানান, ফেসবুকে কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন পোস্ট দেখে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। খামার দেখে ভালো লাগায় দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। গত জুন মাসে পুকুর বাগান-১ প্রজেক্ট থেকে ৮ হাজার ৮৮৮ টাকা মুনাফাও পেয়েছেন। তবে লাভ-ক্ষতি বড় কথা নয়, স্বপ্নপূরণে সহায়তাই তাঁর মূল উদ্দেশ্য বলে জানান তিনি।
মেছবাহুল ইসলাম বলেন, সবাই ভেবেছিল তিনি পারবেন না, কিন্তু তিনি এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। এমনকি পৈতৃক জমিগুলোও বাবার কাছ থেকে বর্গা নিয়ে চাষ করছেন। এখন বাবার আগ্রহই সবচেয়ে বেশি বলে জানান তিনি। ভবিষ্যতে সীমান্তবর্তী শালবন এলাকায় কৃষিভিত্তিক পর্যটন গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের বাইরেও কৃষি খামার করার স্বপ্নের কথা জানান এই তরুণ উদ্যোক্তা।




