প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক জেনো তাঁর বিখ্যাত ডিকোটমি প্যারাডক্সের মাধ্যমে প্রচলিত গতির ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। তাঁর মতে, কোনো বস্তু যদি এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে যেতে চায়, তবে তাকে প্রথমে অর্ধেক পথ অতিক্রম করতে হবে। সেই অর্ধেক পথের আগে আবার তার অর্ধেক, এবং এভাবে চলতে থাকলে অসীম সংখ্যক ধাপ পার হতে হবে। ফলে কখনো গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। জেনো এই যুক্তির ভিত্তিতে দাবি করেন, গতি সম্পূর্ণরূপে একটি বিভ্রম, বাস্তবে এর অস্তিত্ব নেই। জেনো গণিতবিদ ছিলেন না, তবে নিখুঁত যুক্তি প্রয়োগ করে তিনি এই প্যারাডক্স তৈরি করেছিলেন।
প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক অ্যারিস্টটল এই ধারণাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেন। তিনি যুক্তি দেখান যে আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় গতি বিদ্যমান, তাই জেনোর যুক্তি বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। জেনো যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, দর্শনের ভাষায় তাকে 'রিডাকটিও অ্যাড অ্যাবসার্ডাম' বলা হয়—অর্থাৎ কোনো যুক্তিকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে সেটিকে অসম্ভব প্রতিপন্ন করা।
জেনোর এই প্যারাডক্সের সবচেয়ে সরল ও মজার জবাব দিয়েছিলেন সিনিক দার্শনিক ডায়োজিনিস। তিনি কোনো তর্কে না গিয়ে নিজের পায়ে হেঁটে চললেন। এই কাজের মাধ্যমেই তিনি প্রমাণ করলেন যে জেনোর দাবি ভিত্তিহীন। ডায়োজিনিস নিজে এথেন্সের বাজারে একটি পরিত্যক্ত পিপার ভেতরে বাস করতেন এবং অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘লজ্জায় গাল লাল হয়ে যাওয়াটা হলো সততার রং’, এখনও দার্শনিক আলোচনায় স্থান পায়। তিনি আরও বলতেন, কুকুর ও দার্শনিকরা সবচেয়ে বেশি উপকার করে কিন্তু সবচেয়ে কম পুরস্কার পায়।
তবে শুধু ব্যবহারিক উদাহরণ দিয়ে বৈজ্ঞানিক সমাধান হয় না। বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেছেন, জেনোর ভুল ছিল তিনি দূরত্ব অর্ধেক করার সময় সময়ের ধারণাকে বিবেচনায় নেননি। গতি হচ্ছে সময়ের সাপেক্ষে দূরত্ব অতিক্রম করা। যত দূরত্ব ক্ষুদ্র হয়, তা অতিক্রম করতে তত কম সময় লাগে। সময় কিন্তু তার নিজস্ব গতিতে চলতে থাকে, থেমে যায় না। তাই অসীম সংখ্যক ধাপ অতিক্রম করলেও, প্রতিটি ধাপ অতিক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের যোগফল সসীম। ফলে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব।
নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী, স্থির বস্তুতে বল প্রয়োগ করলে তা ত্বরণ লাভ করে এবং গতি শুরু করে। একবার গতি শুরু হলে তা বজায় থাকে। জেনোর যুক্তি বস্তুর স্থির অবস্থা থেকে গতিশীল হওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে, আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব সময়কে স্থান-কালের চতুর্থ মাত্রা হিসেবে চিহ্নিত করে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সময়ের ধারাবাহিকতা একটি বিভ্রম হতে পারে, কিন্তু তা কেবল আলোর গতির কাছাকাছি বেগে প্রাসঙ্গিক। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এর কোনো প্রভাব নেই।
কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, স্থান ও সময়কে অসীমভাবে ভাঙা সম্ভব নয়। প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্যের পর থেকে স্থান-কালের ধারণা পরিবর্তিত হয়। তবে জেনোর প্যারাডক্স সমাধানে এত জটিল তত্ত্বের প্রয়োজন নেই। মৌলিক গাণিতিক ও ভৌত ধারণা—যেমন দূরত্ব ও সময়ের সসীম যোগফল—বোঝাই যথেষ্ট। সূত্র: জিম আল খলিলির 'প্যারাডক্স: দ্য নাইন গ্রেটেস্ট এনিগমাস ইন ফিজিক্স'।




