মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার চেহারা, ধনসম্পদ বা পাণ্ডিত্যের ভিত্তিতে নয়, বরং তার নৈতিক চরিত্রের গুণে। সেই চরিত্রের অন্যতম প্রধান ও শ্রেষ্ঠ গুণাবলির একটি হলো বিনয়। বিনয় কখনো মানুষকে হেয় করে না; বরং এটি তাকে আল্লাহর দৃষ্টিতে সম্মানিত এবং মানুষের কাছে প্রিয় করে তোলে। নিজের মধ্যে এই গুণটি বিকশিত করার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস গড়ে তোলা আবশ্যক।
সর্বপ্রথম, নিজের কাছে থাকা প্রতিটি নেয়ামতকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা অনুগ্রহ হিসেবে গণ্য করতে হবে। অহংকারের মূল বীজ হলো নিজের কৃতিত্বকে সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টা ও যোগ্যতার ফসল ভাবা। অথচ মানুষের জ্ঞান, অর্থ, রূপ, ক্ষমতা বা মর্যাদা—সবকিছুই মহান স্রষ্টার দান। তিনি ইচ্ছা করলে যেকোনো মুহূর্তে তা কেড়ে নিতে পারেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কাছে যে নেয়ামত আছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৫৩)। এই উপলব্ধি যত গভীর হবে, অন্তরে কৃতজ্ঞতার ভাব তত বাড়বে। আর কৃতজ্ঞ হৃদয়ে অহংকারের চেয়ে বিনয়েরই স্থান বেশি।
দ্বিতীয়ত, বিনয় কেবল মুখে বলা কোনো কথা নয়; এটি কর্মের মাধ্যমেই প্রকাশ পেতে হয়। মহানবী (সা.) ছিলেন সৃষ্টিকুলের সেরা মানুষ, তবুও তিনি নিজ ঘরের কাজ নিজ হাতে করতেন, অসুস্থ ব্যক্তিদের খোঁজখবর নিতেন, গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়াতেন এবং সাধারণ মানুষের সাথে বসেই খাবার খেতেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে মর্যাদায় উন্নীত করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)। মানুষের উপকারে এগিয়ে আসা, কারও দুঃখ দূর করা বা কোনো প্রতিদানের আশা না রেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া—এই ধরনের অভ্যাস অন্তরকে নরম করে এবং আত্মায় প্রশান্তি আনে।
তৃতীয়ত, একজন মানুষ তার বন্ধু ও সহচরদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। তাই এমন মানুষের সান্নিধ্য নির্বাচন করা উচিত, যারা সচ্চরিত্র, বিনয় ও তাকওয়ার গুণে গুণান্বিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকের উচিত, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে তা লক্ষ্য করা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৩)। সৎ ও বিনয়ী মানুষের সাহচর্য সুন্দর চরিত্র গঠনে সহায়ক হয় এবং অহংকারের মতো কুপ্রবৃত্তি থেকে দূরে রাখে।
চতুর্থত, ভুল করা মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম। কিন্তু ভুল হওয়া সত্ত্বেও তা স্বীকার না করা বা ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানানো বিনয়ের বিপরীত। একজন প্রকৃত বিনয়ী ব্যক্তি নিজের ত্রুটি স্বীকার করতে দ্বিধা করেন না; বরং আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে ভুল সংশোধনের চেষ্টা চালান। এর ফলে তার সম্মান হ্রাস পায় না, উল্টো মানুষের কাছে তিনি আরও শ্রদ্ধেয় হন এবং আল্লাহর নৈকট্যও লাভ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর রহমানের বান্দারা তো তারা, যারা পৃথিবীতে বিনয়ের সঙ্গে চলাফেরা করে...।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৩)।
পঞ্চমত, যখন মানুষ দুনিয়ার জাঁকজমক, সম্পদ ও ক্ষমতার মোহে ডুবে যায়, তখন সহজেই তার অন্তরে অহংকার প্রবেশ করে। এই অহংকার দূর করার একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ পদ্ধতি হলো মৃত্যু ও আখিরাতের কথা বেশি করে স্মরণ করা। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা দুনিয়ার স্বাদ বিনষ্টকারী তথা মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১৮২৩)। মৃত্যুর চিন্তা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে, আজ যে ধন, মান বা ক্ষমতা নিয়ে সে গর্ব করে, একদিন তার কোনো কিছুই সঙ্গে যাবে না। সঙ্গে যাবে শুধু ঈমান, নেক আমল ও উত্তম চরিত্র।
সবশেষে, বিনয় অর্জন শুধু নিজের প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়; এর জন্য আল্লাহর সাহায্য ও তৌফিকও অপরিহার্য। কারণ, মানুষের অন্তর পরিবর্তনের মালিক একমাত্র তিনিই। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত নিয়মিতভাবে আল্লাহর কাছে উত্তম চরিত্র, বিনয় ও আত্মশুদ্ধির প্রার্থনা করা। নবীজি (সা.) এই উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করতেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি আমার চরিত্রকে সুন্দর করে দাও, যেমন তুমি আমার অবয়ব সুন্দর করেছ।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৩৮২৩)।




