ইসলামের ইতিহাসের একটি বহুল চর্চিত অধ্যায় হলো হস্তীবাহিনীর (আসহাবুল ফিল) মক্কা আক্রমণের ঘটনা, যা পবিত্র কোরআনে লিপিবদ্ধ রয়েছে। বর্তমান যুগের কিছু সংশয়বাদী গবেষক এই ঘটনাকে নিছক উপকথা কিংবা কাবার ইতিহাসের সাথে সম্পর্কহীন দূরবর্তী কোনো আঞ্চলিক সংঘর্ষ হিসেবে চিত্রিত করার ব্যর্থ চেষ্টা করে থাকেন। তবে তারা উপেক্ষা করেন কোরআনের ভাষাগত গঠন, বিষয়ের ধারাবাহিকতা ও ব্যাকরণিক শৃঙ্খলার গুরুত্বপূর্ণ দিকটি। ইসলামি পরিভাষায় যাকে ‘নজমে কোরআন’ বলে, তা নিজেই এ ঘটনার পক্ষে এমন শক্ত সাক্ষ্য দেয় যে, তা প্রত্যাখ্যান করলে পবিত্র গ্রন্থের বাক্যগত সংহতি সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
সুরা ফিলের সূচনায় আল্লাহ তাআলা ঘটনাটি কোনো সাধারণ সংবাদ হিসেবে বিবৃত করেননি। এখানে প্রশ্নবোধক ‘আলাম তারা’ (তুমি কি দেখোনি?) শব্দটি আরবি সাহিত্যের রীতি অনুযায়ী ‘তাকরিরি’ পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত, যা অকাট্য প্রমাণের মাধ্যমে গৃহীত প্রথার স্বীকৃতি নেওয়ার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। এটি কোনো নতুন তথ্য বা অজানা খবর জানানোর জন্য প্রযোজ্য নয়। বরং এর মাধ্যমে বোঝানো হয় যে ঘটনাটি তৎকালীন শ্রোতার কাছে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট ও সুবিদিত, ফলে আলাদা করে তার ব্যাখ্যার দরকার পড়ে না। ভারতের বিশিষ্ট কোরআন গবেষক ইমাম আবদুল হামিদ আল-ফারাহি তাঁর ‘দালাইলুন নিযাম’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, হস্তীবাহিনীর পরিচয়, তাদের আগমনস্থল বা কাবা ধ্বংসের প্রেরণা বিস্তারিত বলা হয়নি, কেননা বিষয়টি তৎকালীন আরবে এতই প্রসিদ্ধ ছিল যে তারা সে বছরকে ‘আমুল ফিল’ বলে ইতিহাস গণনা করত। আরবি ভাষার নীতি হলো, যা সর্বজনবিদিত, তার প্রতি সংক্ষেপে ইশারা করাই সর্বোচ্চ অলঙ্কার।
যে সময়ে সুরা ফিল অবতীর্ণ হয়, তখন মক্কার কোরাইশরা নবিজির (সা.) দাবির সামান্য ত্রুটি খুঁজে পেতে উদগ্রীব ছিল। যদি হস্তীবাহিনীর কাহিনী বানোয়াট হতো, তাহলে তারা তৎক্ষণাৎ বলে উঠত যে এমন কোনো ঘটনা তাদের বা পূর্বপুরুষদের ইতিহাসে অনুপস্থিত। কিন্তু চরম বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, একজন অবিশ্বাসীও এই আয়াতের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। ধ্রুপদি আরবি সাহিত্যের পণ্ডিত আল-জাহিজ তাঁর ‘কিতাবুল হায়াওয়ান’-এ মন্তব্য করেছেন যে, নবীকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করতে মরিয়া কোরাইশরা একটি কল্পিত কথার আভাস পেলেও তা নিয়ে বিতর্কের সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করত না। তাদের নিরঙ্কুশ নীরবতাই প্রমাণ করে যে ঘটনটি তাদের স্বচক্ষে দেখা বা পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে জানা এক অমোচনীয় ঐতিহাসিক সত্য।
আয়াতটির সূক্ষ্ম শব্দ চয়নেও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যঞ্জনা লুকিয়ে রয়েছে। এতে আল্লাহ তাআলা ‘ফাআলা রব্বুকা’ (তোমার প্রতিপালক কেমন আচরণ করেছিলেন) বলেছেন। চমকপ্রদ বিষয় এই যে, হস্তীবাহিনীর ঘটনা নবীজির জন্মবর্ষের, অর্থাৎ নবুয়ত লাভের অনেক আগের। কিন্তু সুদীর্ঘ কাল পরে নাজিল হওয়া আয়াতে ‘তোমার প্রতিপালক’ বলে নবীর সাথে নিজের সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে তিনি যেন দুটি ঐতিহাসিক সত্যকে একই সূত্রে গ্রথিত করেছেন: যে পরম সত্তা নবুয়তের আগে আসমানি কৌশলে তাঁর ঘর রক্ষা করেছিলেন, সেই একই প্রতিপালক নবুয়তের পর প্রেরিত সর্বশেষ রাসুল এবং তাঁর আনা দীনের হিফাজতেরও দায়িত্ব নিয়েছেন।
কোরআনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর সবচেয়ে দৃঢ় প্রমাণ মেলে সুরা ফিল ও তার পরবর্তী সুরা ‘কোরাইশ’-এর গভীর সম্পর্ক বিচার করলে। কোরআন শুধু বিচ্ছিন্ন সুরার সংগ্রহ নয়, বরং এর ধারাবাহিকতা এক অলৌকিক শৃঙ্খলের মতো গ্রথিত। সুরা কোরাইশের শুরুতে বলা হয়েছে, “কোরাইশের অভ্যাসের খাতিরে—তাদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ অভ্যাসের খাতিরে; সুতরাং তাদের উচিত এই ঘরের রবের ইবাদত করা।” ব্যাকরণগতভাবে এখানে ‘লি-ইলাফি’ বর্ণটি একটি কারণ নির্দেশক হরফ যা পূর্বে ঘটিত কোনো ঘটনার পরিণতি নির্দেশ করে। অর্থাৎ আবরাহার বিশাল বাহিনীকে অলৌকিকভাবে ধ্বংস করে কাবার রক্ষা করার ফলেই পুরো আরব উপদ্বীপে কাবার মর্যাদা ও কোরাইশ বংশের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই আসমানি সুরক্ষার জন্যই ডাকাত বা অন্য কোনো গোত্র তাদের বাণিজ্য কাফেলায় আঘাত করতে সাহস পেত না। ফলে শীতে ইয়ামেন ও গ্রীষ্মে সিরিয়ায় তাদের সুরক্ষিত যাতায়াত ও বাণিজ্যের পথ তৈরি হয়।
কোরআনের এই ব্যাকরণিক যোগসূত্র প্রমাণ করে, সুরা ফিলের ঘটনা না ঘটলে সুরা কোরাইশের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যসুবিধা (ই-ইলাফ)-এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি থাকতে পারে না। কোরআন এখানে চার ধাপের এক যুক্তি নির্মাণ করেছে: আসমানি সুরক্ষা ➔ নিরাপত্তা ➔ অর্থনৈতিক প্রাচুর্য ➔ প্রতিপালকের ইবাদতের অনিবার্যতা। এই ধাপগুলোর যেকোনো একটিকে বাদ দিলে বা হস্তীবাহিনীর ঘটনাকে অস্বীকার করলে সুরা কোরাইশের সমগ্র অর্থই পঙ্গু হয়ে যাবে। মিসরের বিশিষ্ট কোরআন গবেষক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ দরাজ তাঁর ‘আন-নাবাউল আজিম’ গ্রন্থে কুরআনের এই অলৌকিক বুননকে মানবদেহের অঙ্গসংস্থানের সাথে তুলনা করেছেন। তার মতে, সুরা ফিলের সত্যতা বুঝতে পুরো কোরআনের বার্তা নিয়ে ভাবতে হবে। তাই হস্তীবাহিনীর কাহিনী কোনো বিচ্ছিন্ন উপকথা নয়, এটিকে মিথ্যা ধরলে কোরআনে কোরাইশদের নিরাপদ জীবনের বর্ণনা ও মক্কার বায়তুল্লাহকে ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে ঘোষণার সব বক্তব্যই অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।




