বর্তমান সময়ে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও হোটেলে বুফে খাবারের চল ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এ পদ্ধতিতে কর্তৃপক্ষ বড় পাত্রে নানান ধরণের খাবার প্রদর্শন করে এবং নির্দিষ্ট সময় ও স্থির মূল্যের বিনিময়ে গ্রাহক ইচ্ছেমতো ভক্ষণ করতে পারেন, তবে বাইরে নেওয়া নিষেধ। ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিতে এই চুক্তির বাহ্যিক রূপ বৈধ হওয়ার কথা নয়, কারণ মূল্য নির্ধারিত থাকলেও বিক্রিত বস্তুর পরিমাণ সম্পূর্ণরূপে অনির্দিষ্ট থাকে।

ক্রয়-বিক্রয়ের শুদ্ধতার জন্য পণ্য ও তার পরিমাণ জানা একটি অপরিহার্য শর্ত। প্রথিতযশা মুফতি তাকি উসমানি তাঁর ‘ফিকহুল বুয়ু’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ইসলামি বিধান অনুযায়ী এ ধরনের চুক্তি বৈধ নয়। কারণ, চুক্তির সময়ে বিক্রিত খাবারের পরিমাণ অজানা থাকায় উভয় পক্ষের জন্য প্রতারণার ঝুঁকি বিদ্যমান থাকে। যিনি বেশি ক্ষুধার্ত, তিনি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি খাবার গ্রহণ করে ব্যবসায়ীকে ক্ষতির সম্মুখীন করতে পারেন। আবার স্বল্পাহারী ব্যক্তি নিজেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। মহানবী (সা.) এ জাতীয় অনিশ্চয়তা ও ধোঁকামূলক বাণিজ্য থেকে নিষেধ করেছেন।

তা সত্ত্বেও, বর্তমান প্রেক্ষিতে বুফে একটি স্বীকৃত ও সর্বজনগ্রাহ্য ব্যবসায়িক প্রথায় পরিণত হয়েছে। উভয় পক্ষই স্বতঃস্ফুর্তভাবে এর স্বরূপ জেনে ও সম্ভবনার ভিত্তিতে লাভ-ক্ষতি মেনে নিয়েই চুক্তিতে প্রবেশ করে এবং বাস্তবে এটি নিয়ে কোনো বিরোধ সৃষ্টি হয় না। ফিকহের পরিভাষায় এখানে যে 'গারার' (অনিশ্চয়তা) রয়েছে, তা হল 'গারারে ইয়াসির'—অর্থাৎ নগণ্য ও উপেক্ষণীয় অনিশ্চয়তা, যা কোনো চুক্তিকে বাতিল করে না। এই যুক্তিতে সমসাময়িক অসংখ্য ফকিহ বুফে সিস্টেমকে বৈধ আখ্যা দিয়েছেন এবং এতে খাদ্যগ্রহণও বৈধ বলে মত দিয়েছেন।

একটি পরিচিত উদাহরণের সাদৃশ্য এখানে দেখা যায়। নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে গোসলখানা ব্যবহারের বিধানেও একই চিত্র লক্ষ্যণীয়। সেখানে ব্যবহারকারীর পানি ও সময়ের পরিমাণ অনির্ধারিত থাকা সত্ত্বেও ফিকহবিদগণ সর্বসম্মতভাবে এটি বৈধ সাব্যস্ত করেছেন। কারণ, এই অনিশ্চয়তা সমাজে স্বীকৃত এবং এটি কখনোই বিবাদের কারণ হয়ে ওঠে না। একই যুক্তির অনুসরণে বুফে ব্যবস্থার লেনদেনকেও বৈধ মনে করা হয়।

তবে এই পদ্ধতিতে খাবার নেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্তাবলী খেয়াল রাখতে হবে। নিজের প্রয়োজনে পরিমিত খাবার গ্রহণ করাই প্রথম শর্ত, কেননা অতিভোজন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ। দ্বিতীয়ত, কোনোভাবেই যেন খাদ্য নষ্ট বা অপচয় না হয়। গ্রহণকারীকে কেবল ততটুকুই নিতে হবে যতটুকু তিনি খেতে সক্ষম, অপচয়কারীদের প্রতি আল্লাহ পছন্দ করেন না বলে কোরআনে উল্লেখ আছে। অতিরিক্ত নেওয়া খাবার ফেলে দেওয়া ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

বুফের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, গ্রাহক খাবারের পূর্ণ মালিকানা পাচ্ছেন না, বরং নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে খাওয়ার অনুমতি পেয়ে থাকেন। তিনি যে পরিমাণ খাবার প্রকৃতপক্ষে ভক্ষণ করেন, সেই অংশটুকুর ওপরই মালিকানা স্থাপিত হয়। যদি কেউ বড় পাত্র থেকে খাবার তুলে নিজের থালায় নেন, কিন্তু পরে তা ভেক্ষণ না করেন, সেক্ষেত্রে স্থানীয় প্রচলিত রীতিনীতির ওপর এর হুকুম নির্ভর করে। যদি রীতি হয় যে থালায় তোলা খাবার মূল পাত্রে আর ফেরত দেওয়া যায় না এবং তা গ্রাহকের জন্য নির্ধারিত হয়ে যায়, তাহলে তা তার মালিকানায় আসবে। পক্ষান্তরে, যদি ফেরত দেওয়ার প্রচলন থাকে এবং তা গ্রাহকের মালিকানা বলে ধরা না হয়, তবে সেটি তার মালিকানাভুক্ত হবে না।