হাই কোর্টের এক বেঞ্চ জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডকে পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা করার নির্দেশ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) তালিকায় ঋণখেলাপি হিসেবে নাম থাকার বিষয়ে আগের বিচারাধীন কার্যক্রম ও আদালতের আদেশ গোপন করে হাই কোর্টে নতুন করে আপিল করায় এই জরিমানা করা হয়। বুধবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মাহমুদ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ আপিলটি (ফার্স্ট মিসলেনিয়াস আপিল) খারিজ করে এ আদেশ দেয়। জরিমানার অর্থ এক মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রধান বিচারপতির পরামর্শক্রমে এই অর্থ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের উন্নত চিকিৎসায় ব্যয় করা হবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল, সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (মাসুদ) ও অন্যান্য। জিপিএইচ ইস্পাতের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ হোসাইন, পূর্ণেন্দু বিকাশ দাস ও মোহাম্মদ আক্তার হোসাইন। আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি আপিল বিভাগে চলমান রিট ও হাই কোর্টের আদেশের তথ্য গোপন করে নতুন আপিল করেছিল। তিনি আরও বলেন, জিপিএইচ ইস্পাত আগে সিআইবি প্রতিবেদনে তাদের নাম না রাখার নির্দেশনা চেয়ে হাই কোর্টে রিট করেছিল, যেখানে রুল ও স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে গেলে ৯ জুলাই সেই স্থগিতাদেশ স্থগিত হয়, ফলে সিআইবি প্রতিবেদনে নাম প্রকাশের নির্দেশ আর বহাল থাকে।
রাষ্ট্রপক্ষের দাখিল করা লিখিত 'স্টেটমেন্ট অব ফ্যাক্ট'-এ বলা হয়, একই বিষয়ে হাই কোর্ট ও আপিল বিভাগে কার্যক্রম থাকা সত্ত্বেও সেই তথ্য গোপন করে নিম্ন আদালতে মামলা করা হয়, এবং পরে ওই মামলার আদেশের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে আপিল করা হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল এটিকে আদালতের প্রতি প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, বর্তমানে প্রতিটি ক্ষেত্রে সততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের প্রচেষ্টার মধ্যে এমন কাজ চলতে দেওয়া যায় না। তিনি জানান, বিষয়টি আদালতে এফিডেভিট আকারে উপস্থাপন করা হলে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং পূর্বের রিট ও আপিল বিভাগের আদেশ সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সুচতুর ব্যক্তিরা ভিন্ন ভিন্ন মামলায় ভিন্ন আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে তথ্য গোপন রাখেন।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাসুদ বলেন, আদালতের নজরে আনার পর আপিলকারী পক্ষ আর আপিল চালাতে চায়নি, কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ জানায় বিষয়টি এভাবে শেষ হওয়া উচিত নয়। কারণ আদালতের প্রতি প্রতারণার অভিযোগ বিচারিক নথিতে থাকা প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করে বলেন, কেউ এভাবে পার পেয়ে গেলে আরও অনেকে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
জিপিএইচ ইস্পাতের আইনজীবী মোহাম্মদ আক্তার হোসাইন বলেন, ২১০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপির বিষয়টি এভাবে দেখার সুযোগ নেই, কারণ অনেক ব্যাংকের ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে এবং তারা ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে। তিনি জানান, শুধু একটি ব্যাংকের ক্লিয়ারেন্স বাকি ছিল বলেই সিআইবি রিপোর্ট দেওয়া হয় এবং তারা হাই কোর্টে গিয়েছিলেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়ার পর মক্কেলের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর জিপিএইচ ইস্পাতের ঋণ নীতিগত সহায়তার অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ হিসেবে শ্রেণিকরণ না করার নির্দেশ দেয়। পরে ২০২৬ সালের ৩ জুন সেই সুবিধার মেয়াদ ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, নীতিগত সহায়তা কার্যকর থাকার পরও তাদের নাম সিআইবি ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত ও প্রকাশ করা হয়। এ অবস্থায় ২০২৬ সালে হাই কোর্টে রিট আবেদন করে জিপিএইচ ইস্পাত। হাই কোর্ট গত ৭ জুলাই রুল জারির পাশাপাশি ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিআইবি ডেটাবেজে নাম প্রকাশের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেয়, যা ২৫টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাব অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক চেম্বার আদালতে আবেদন করলে ৯ জুলাই হাই কোর্টের স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়। এরপরও ১২ জুলাই জিপিএইচ ইস্পাত একই বিষয়ে ঢাকার ৫ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে টাইটেল স্যুট দায়ের করে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চায়, যা ১৫ জুলাই খারিজ হয়। নিম্ন আদালতের সেই আদেশের বিরুদ্ধে ফার্স্ট মিসলেনিয়াস আপিলে আগের মামলার তথ্য গোপন করা হয়েছিল বলে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ তোলে। আদালত বিষয়টি লিখিতভাবে উপস্থাপনের নির্দেশ দিলে অ্যাটর্নি জেনারেল স্টেটমেন্ট অব ফ্যাক্ট দাখিল করেন এবং তার ভিত্তিতেই বুধবার জরিমানার আদেশ দেওয়া হয়।




