দীর্ঘদিন ধরেই ডেঙ্গু ভাইরাসের আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন চিকিৎসক ও গবেষকরা। ভাইরাসের এই রূপ বদল নতুন নয়, বরং এটি ভাইরাসের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তবে বর্তমানে ডেঙ্গুর যে রূপ দেখা যাচ্ছে, তা আগের তুলনায় অনেকটাই অচেনা ও ভিন্ন। এর ফলে রোগ শনাক্ত করতে সময় লাগতে পারে, আবার গুরুতর জটিলতার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। তাই এই সময়ে সামান্য জ্বর হলেও সতর্ক থাকা জরুরি। এমনকি জ্বর কমে গেলেও কিছু দিন বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন, কারণ জ্বর কমার পরবর্তী এক থেকে দুই দিন জটিলতার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।

আগে ডেঙ্গু হলে তীব্র জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, পিঠ ও গিরায় প্রচণ্ড ব্যথা দেখা দিত, যাকে অনেকে 'হাড়ভাঙা জ্বর' নামেও চেনেন। শরীরে লালচে র্যাশও দেখা যেত। কিন্তু এখন এই ধরনের লক্ষণগুলো তেমন একটা দেখা যায় না। অনেক রোগী আছেন, যাদের লক্ষণই প্রকাশ পায় না। মৃদু জ্বর বা সামান্য গা ম্যাজম্যাজ ভাব থেকে শুরু করে হঠাৎ করেই দুই দিনের মধ্যে রোগীর অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু প্রায় লক্ষণবিহীন থাকতে পারে।

অন্যান্য সংক্রমণে জ্বর কমে যাওয়া সুস্থতার লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পরই শুরু হয় আসল বিপদ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সময়টিকে বলা হয় 'ক্রিটিক্যাল ফেইজ'। এই পর্যায়ে হৃৎস্পন্দন দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, রক্তচাপ কমে যেতে পারে এবং রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। জ্বর কমে যাওয়ার পর অন্তত তিন দিন অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এই সময় নিয়মিত প্লাটিলেট কাউন্ট পরীক্ষা করানোও জরুরি।

বদলে যাওয়া ডেঙ্গুর আরেকটি চরিত্র হলো, এটি এখন শরীরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে দ্রুত আক্রমণ করছে। লিভার, কিডনি, হৃদযন্ত্র বা মস্তিষ্ক আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বেড়েই চলেছে। জ্বরের ওঠানামা, অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন, তীব্র পেটব্যথা, জন্ডিস, পাতলা পায়খানা, খিঁচুনি বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।

ডেঙ্গুর মূলত চারটি ভ্যারিয়েন্ট রয়েছে — ডেন ১, ডেন ২, ডেন ৩ এবং ডেন ৪। অতীতে এই ধরনের কোনো একটিতে আক্রান্ত হওয়ার পর যদি আবার ভিন্ন ধরনে আক্রান্ত হন, তাহলে 'ডেঙ্গু শক সিনড্রোম' হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এছাড়া ডেঙ্গু হয়েছে অথচ পরীক্ষায় ভাইরাসের অ্যান্টিজেন বা অ্যান্টিবডি শনাক্ত না হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ফলে জ্বরটি ডেঙ্গুজনিত নাকি অন্য কোনো কারণে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। অনেক সময় রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি, বিশেষ করে পালস, রক্তচাপ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হওয়া এবং প্লাটিলেট কমে যাওয়া দেখে পরে নিশ্চিত হওয়া যায় যে জ্বরটি ডেঙ্গুর কারণেই হয়েছিল।

কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বারবার বমি, তীব্র পেটব্যথা, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, মাড়ি বা নাক থেকে রক্তপাত, রক্তবমি, ফুসফুস-হৃৎপিণ্ড-পেটে পানি জমে যাওয়া, লিভার ফুলে যাওয়া এবং রক্তে লোহিত রক্তকণিকার শতকরা হার (পিসিভি) ক্রমাগত বেড়ে যাওয়া — এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা. ইমনুল ইসলাম জানিয়েছেন, আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার, মিরপুর ৬, ঢাকায় তার চেম্বার রয়েছে। তিনি ডেঙ্গু জ্বরে পেঁপেপাতার রস খাওয়ার বিষয়েও সতর্ক করেছেন।