বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে লেখা চিঠিপত্র তাঁর সাহিত্যসম্ভারের এক অনন্য সম্পদ। কবিতা, গল্প বা প্রবন্ধে আমরা যেসব রবীন্দ্রনাথকে চিনি, চিঠিগুলোতে তিনি আরও অন্তরঙ্গ, আরও অকপট — সেখানে যেমন রয়েছে তাঁর অলংকারময় ভাষা, তেমনি দৈনন্দিন জীবন, ব্যক্তিগত অনুভব, সময় ও সমাজ সম্পর্কে প্রখর পর্যবেক্ষণ। কখনো তিনি স্নেহময় অভিভাবক, কখনো শিল্পস্রষ্টা, আবার কখনোবা চিন্তাশীল দার্শনিক রূপে ধরা দিয়েছেন।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চারটি চিঠি ও একটি দাওয়াতপত্র সম্প্রতি সচিত্র আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। এসব পত্র পাঠকের কাছে সেই দুর্লভ দরজা খুলে দেবে, যেখানে কবি, মানুষ ও সময় একাকার। ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যম হলেও কালের বিবর্তনে এগুলো আজ ইতিহাসের মূল্যবান দলিল; কারণ এতে নিহিত আছে এক যুগের সংস্কৃতি, সাহিত্যচর্চা ও মননজগতের স্পন্দন।
চিঠিগুলো ২০২৫ সালে প্রকাশিত "ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ: অগ্রন্থিত চিঠিপত্র" বইয়ে সংকলিত হয়েছে। সংকলক ও সম্পাদক আনিসুর রহমান বইটিতে কেবল চিঠির পাঠোদ্ধার রাখলেও চিঠিগুলোর ছবি যুক্ত করেননি। মুর্তজা বশীর সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত এই দুর্লভ চিঠিগুলো এবার সচিত্র প্রকাশিত হলো।
প্রথম চিঠিতে (২৯ বৈশাখ, ১৩২৯, শান্তিনিকেতন) রবীন্দ্রনাথ ড. শহীদুল্লাহকে জানান, "বিশ্বভারতীকে সাধারণের হস্তে সমর্পণ করিবার উদ্যোগ প্রায় সমাধা হইয়াছে।" বিশ্বভারতীর সংসদের (ম্যানেজিং কমিটি) সদস্য হিসেবে তাঁকে বরণ করা হয়েছে উল্লেখ করে সম্মতি জানাতে অনুরোধ করেন কবি।
দ্বিতীয় চিঠিতে (৩রা ফেব্রুয়ারি, ১৯২৪, শান্তিনিকেতন) ড. শহীদুল্লাহর অনুরোধে "জীবন স্মৃতি" ও "ছিন্নপত্র" থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করে পুস্তকাকারে ছাপানোর পূর্ণ সম্মতি দেন রবীন্দ্রনাথ।
একটি দাওয়াতপত্রে (তারিখ উল্লেখ নেই) শান্তিনিকেতন আশ্রমে গোধূলি লগ্নে তাঁর পৌত্রী নন্দিনী দেবীর সঙ্গে বোস্বাইবাসী মোরারজি পরিবারের অজিত সিংহের শুভ পরিণয় উপলক্ষে ড. শহীদুল্লাহকে উৎসবে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
২৯ জুলাই, ১৯৩২ তারিখের চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ ড. শহীদুল্লাহর "ভাষা ও সাহিত্য" বই পড়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখকদের আহ্বান জানিয়ে শহীদুল্লাহর প্রবন্ধগুলো হিন্দুদেরও প্রাসঙ্গিক। ভাষাতত্ত্বে শহীদুল্লাহর যোগ্যতার প্রশংসা করে কবি নিজের সম্পর্কে বিনীতভাবে বলেন, "যখন আমি এই অনুশীলনে প্রবৃত্ত হয়েছিলেম তখন এ পথে আমি ছিলাম একা... অন্ধকারে আমার প্রদীপ ছিল না, হাৎড়িয়ে বেড়িয়েছি।" বাংলা ভাষায় আরবী ও পারসী সাহিত্যের অনুবাদকে তিনি কর্তব্য মনে করলেও বিশ্বভারতীর অর্থদৈন্য দূর না হওয়া পর্যন্ত এ কাজে প্রবৃত্ত হওয়া সম্ভব নয় বলে জানান। তবে বিদেশী উচ্চশ্রেণীয় কাব্যের পদ্যে অনুবাদ প্রসঙ্গে তাঁর স্পষ্ট মত — কবিতার একদিকে ভাবার্থ, অন্যদিকে ধ্বনির ইন্দ্রজাল; ভাবার্থ ভাষান্তর করা গেলেও ধ্বনির মোহ এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় আনা যায় না। এই কারণে ড. শহীদুল্লাহর হাফেজ অনুবাদ প্রচেষ্টার অনুমোদন দিতে পারেননি কবি।
সর্বশেষ চিঠিতে (২/৯/৩৬, শান্তিনিকেতন) রবীন্দ্রনাথ ড. শহীদুল্লাহর রচিত বাংলা ব্যাকরণ পাঠে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, "ব্যাকরণখানি সকল দিকেই সম্পূর্ণ হইয়াছে, এতে ছাত্রদের উপকার হবে।" বইটি শান্তিনিকেতনের বাংলা বিভাগের অধ্যাপকদের হাতে দেওয়ার কথাও জানান তিনি।




