একটি ভয়াবহ তাপপ্রবাহ সমগ্র ইউরোপকে গ্রাস করার পরিপ্রেক্ষিতে ইতালি তাদের সকল প্রধান নগরীকে সর্বোচ্চ তাপ সতর্কতার আওতায় নিয়ে এসেছে। এই দাবদাহ অস্ট্রিয়ায় জাতীয় তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে, ফ্রান্সে দাবানলকে উসকে দিচ্ছে এবং মহাদেশজুড়ে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার কারণে একাধিক দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ ফারেনহাইট) অতিক্রম করে যাওয়ায় লাখখো মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার তাদের জাতীয় তাপ নজরদারি ব্যবস্থার আওতাভুক্ত ২৭টি শহরের প্রতিটিৎকেই 'রেড অ্যালার্ট'-এর আওতায় নিয়ে এসেছে, যা চলতি বছরে এই পুরো নেটওয়ার্কটির জন্য একইসঙ্গে সর্বোচ্চ সতর্কতার প্রথম ঘটনা। এ এলার্টগুলো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ত্রিয়েস্তে থেকে শুরু করে সিসিলির পালেরমো পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এটি কেবল বয়োবৃদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি অসুখে ভোগা মানুষ নয়, বরং সমগ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে। কর্তৃপক্ষ বাসিন্দা ও পর্যটকদের দিনের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়ে সরাসরি সূর্যের তাপে পরিহণ করতে, সম্ভব হলে ঘরের অভ্যন্তরেথাকতে এবং প্রচুর পানি পান করার অনুরোধ জানিয়েছে। কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ সেলসইয়ানের (১০৪ ফারেনহাইট) কাছাকাছি পৌঁছোচ্ছে। প্রচণ্ড এই তাপের কারণে রোমের কলোসিয়াম ও প্যানথিয়নের মতো দর্শনীয়স্থানের সন্ধ্যাকালীন খোলা থাকার সময় বাড়ানো হয়েছে। কলোসিয়ামের প্রবেশপথে শীতল বারি কণার পাখা বসানো হয়েছে এবং অতিরিক্ত চিকিৎসা বুথের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
অস্ট্রিয়াতে বুধবার সবচেয়ে তীব্র তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। জিওস্ফিয়ার অস্ট্রিয়ার তথ্য অনুযায়ী, স্লোভাক সীমান্তের নিকটবর্তী বাড ডইচ-আল্টেনবুর্গ গ্রামে পারদ ৪১.২ ডিগ্রি সেলসইন (১০৬.২ ফারেনহাইট) ছুঁয়েছে, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মারাত্মক খরার সঙ্গেও লড়াই করছে অস্ট্রিয়া। জাতীয়ভাবে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে ২৭% কম ছিল, যেখানে পূর্বের কিছু অঞ্চল স্বাভাবিক সময়ের অর্ধেক বৃষ্টিপাত পেয়েছে। আবহাওয়াবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার অর্লিক মন্তব্য করেছেন যে, দেশের কিছু এলাকা ১৮৮৫ সালের পর এত শুষ্ক অবস্থার মুখোমুখি হয়নি।
হাঙ্গেরিতে দীর্ঘমেয়াদি খরা এবং দানিউব নদীর পানি রেকর্ড সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যাওয়ায় দেশটির একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কেন্দ্রটি তার চুল্লি ঠান্ডা করতে নদীর পানির উপর নির্ভরশীল। চালকেরা উৎপাদন স্বাভাবিক পরিমাণের প্রায় ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছেন, যার ফলে রেকর্ড ভাঙা এই তাপপ্রবাহের মধ্যেই সরকার জরুরি বিদ্যুৎ সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালু করে। কর্তৃপক্ষ বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান ও গৃহস্থদের বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে বলেছে, বিশেষ করে সন্ধ্যা ৫টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে বিদ্যুৎ চাহিদার শীর্ষ সময়ে। এই সময়ের মধ্যে মালবাহী ট্রেন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং বুদাপেস্টের দর্শনীয় স্থানগুলোর সৌন্দর্যবর্ধক আলো নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। জ্বালানি কোম্পানি মল, ঔষধ প্রস্তুতকারক গেডিয়ন রিক্টার এবং গাড়ি প্রস্তুতকারক সুজুকি, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, অডি ও বিute-র মতো বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান বিদ্যুতের ব্যবহার সীমিত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। বিদ্যুৎ সংরক্ষণের প্রয়াসে সরকার এ সপ্তাহের সংসদীয় অধিবেশনও স্থগিত করে দিয়েছে। পুরো দেশজুড়ে তাপপ্রবাহ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে দিচ্ছে। বুধবার রাতে বুদাপেস্ট তার ইতিহাসের উষ্ণতম রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করে, যেখানে তাপমাত্রা মাত্র ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৮২ ফারেনহাইট) পর্যন্ত নামে, যা প্রচণ্ড গরমের স্থায়ীউপস্থিতিকে আরও প্রকট করে তোলে।
রাইন ও অন্যান্য নদ-নদীর পানি কমতে থাকায় জার্মানি পরিবহন ও শিল্পের উপর খরার প্রভাব নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মুখোমুখি হয়েছে। পরিবহন মন্ত্রী স্টেফান বিলগার বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সতর্ক করে বলেন যে নিম্ন পানির স্তর অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন, শিল্প এবং বৃহত্তর সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। পরিবেশবাদী সংগঠন বুন্ড কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানায় যে, কেবল অর্থনৈতিক প্রভাবের প্রতি নয়, বরং ভূদৃশ্যে আরও পানি ধরে রাখা এবং খরার সময় নদী থেকে পানি উত্তোলন কমানোর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নদীগুলোকে আরও সহনীয় করে তোলার দিকেও মনোযোগ দিতে হবে।
দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সে, কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে একটি বড় দাবানল আর ছড়াচ্ছে না তবে তা পুনরায় জ্বলে ওঠার সক্ষমতা ধরে রেখেছে, তাই দমকলকর্মীরা ভাগর অঞ্চলে ব্যাপক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। ২০ জুলাই শুরু হওয়া এই অগ্নিকাণ্ডটি ৬০ বর্গ কিলোমিটারের বেশি (২৩ বর্গমাইল) এলাকা পুড়িয়ে দিয়েছে, যা অঞ্চলটির সাম্প্রতিক কয়েক দশকের মধ্যে রেকর্ড। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রবল বাতাস ও অত্যধিক শুষ্ক অবস্থার কারণে দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সে অতিরিক্ত দাবানলের জন্য উচ্চ ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে।
বলকান জুড়ে বৃহস্পতিবার তাপপ্রবাহ চরম আকার ধারণ করে, যখন তাপমাত্রা ৪০ সেলসিয়ানের (১০৪ ফারেনহাইট) কাছাকাছি পৌঁছে এবং কর্তৃপক্ষ খরা ও দাবানলের সাথে লড়াই করে। সার্বিয়ায়, টানা কয়েক দিনের শুষ্ক আবগাওয়ার পর দমকলকর্মীরা একাধিক অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠোর সংগ্রাম করে। বেলগ্রেডের পশ্চিমে একটি বড় অগ্নিকাণ্ড পাইন বনে জ্বলে ওঠে, অন্যটি ক্রালিয়েভোর কেন্দ্রীয় শহরের কাছে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দুর্গম ভূখণ্ড আগুন নেভানোর চেষ্টাকে জটিল করে তোলে। প্রতিবেশী ক্রোয়েশিয়ায়, ডুব্রোভনিকের পর্যটকরা অ্যাড্রিয়াটিক উপকূলে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সময় দিনের উত্তপ্ত সময়ে ছায়ায় আশ্রয় নেয় এবং সমুদ্র সৈকত এড়িয়ে চলে।



