পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র একটি রাষ্ট্র আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্র মাদাগাস্কার। দেশটির রাজধানী আন্তানানারিভোতে প্রায় ১৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার ফরাসি ঋণে নির্মিত একটি কেবল কার পরিবহন ব্যবস্থা এখন জনশূন্য অবস্থায় ঝুলে রয়েছে। কয়েক সপ্তাহ চালুর পরই কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া এই প্রকল্পটিকে ১৭ কোটি ডলারের একটি বিশাল ভুল হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সাবাহারান আফ্রিকায় এমন অভিনব পরিবহন ব্যবস্থার ধারণা দিয়েছিলেন দেশটির সদ্য ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট এন্ড্রি রাজোলিনা।

অতিমাত্রায় যানজটপূর্ণ নগরীটির বাসিন্দাদের দৈনন্দিন যাত্রাকে স্বল্প সময়ে স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। রাজোলিনার যুক্তি দিয়েছিলেন, দুর্বল ভিত্তির কারণে হালকা রেল চালু অসম্ভব, তাই জীর্ণ মিনিবাসের ভরসা কাটাতে আকাশপথে যাত্রাই একমাত্র পথ। ২০২৪ সালে এর উদ্বোধনকে তিনি ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ার নির্মাণের সঙ্গেও তুলনা করেছিলেন। কিন্তু সেই তুলনা কোনো কাজে আসেনি।

শহরবাসী এই কেবল কার প্রকল্পের বিরোধিতা করেছিল মূলত দুটি কারণে। প্রথমটি হলো ভাড়ার পরিমাণ। এই কেবল কারে প্রতি ট্রিপে খরচ ধার্য করা হয় ৭০ থেকে ৯০ মার্কিন সেন্ট, যা প্রচলিত মিনিগাস ট্যাক্সির চেয়ে ছয় থেকে আট গুণ বেশি। বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদাগাস্কারের একজন সাধারণ যাত্রীর মাসিক গড় বেতন মাত্র ৭২ ডলার, আর জনসংখ্যার প্রায় ৭৫ শতাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। সেখানকার মানুষ সময়ের চেয়ে টাকা সাশ্রয়কেই অগ্রাধিকার দিয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপরিবহন পরামর্শক পিটার অন্ডারওয়াটার বলেছেন, “লোকজন স্পষ্টতই এটি ব্যবহার করবে না, কারণ সময়ের চেয়ে অর্থ এদের কাছে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত ট্যাক্সির চেয়ে ছয় গুণ বেশি ভাড়া হলে মানুষ জ্যামে বসেই থাকবে।” অপরদিকে, দ্বিতীয় কারণটি ছিল অবিশ্বাস। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ ও পানি সংকটের নাগরিকদের প্রশ্ন, বিদ্যুৎ চলে গেলে ২০ মিটারের বেশি উচ্চতায় আটকে পড়ার ভয়ে কার কেবল কারে চড়তে রাজি হবে? স্থানীয় এক দোকানির সরল প্রশ্ন, “যে শহরে রাস্তা ঠিক করতে পারে না, সেখানে বিদ্যুৎ চলে গেলে মাটি থেকে ২০ মিটার উঁচুতে কেউ কীভাবে আস্থা রাখতে পারে?”

সেই বিদ্যুৎ বিভ্রাটও বারবার কেবল কারটিকে অচল করে দিয়েছিল। গত বছর যুব সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে হওয়া বিক্ষোভের পর এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাজোলিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। অভ্যুত্থানের সময় কিছু কেবল কারের স্টেশন পুড়িয়ে দেওয়া হয় বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়, যা সদরকারের প্রতি জনঅসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ। সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ নিয়ে এখনও কোনো মন্তব্য করেনি।

প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী ফরাসি কোম্পানিগুলির একটি জোটি গত মার্চে সিস্টেমটি পরিদর্শন করে। ফরাসি দলটি সংবাদমাধ্যমকে জানায়, তারা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন মাদাগাস্কারের কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছে যাতে তারা “পরবর্তী পদক্ষেপ” সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই ব্যর্থতার মধ্যে দিয়েও আফ্রিকায় নগরায়নের চাপ বাড়ছেই। ১৯৬০-এর দশকের তুলনায় রাজধানীটির জনসংখ্যা বেড়েছে ১০ গুণের বেশি। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার মতে, মহাদেশটির বর্তমান ৭০ কোটি শহুরে জনসংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হতে পারে, যা গণপরিবহনের চাপ আরও বাড়াবে।

তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপোর্ট আফ্রিকা বলছে, দ্রুত নগরায়নের হার থাকলেও আফ্রিকার সরকারি পরিবহন পরিকাঠামো বিশ্বের মধ্যে অন্যতম অনুন্নত। এই সুযোগে বেসরকারি খাতের অগণিত মিনিবাসই অধিকাংশ মানুষের নিয়মিত বাহন হয়ে রয়েছে। অফিসকর্মী হেরি রাতসিমবাজাফি জানিয়েছেন, সিটি সেন্টার পর্যন্ত না যাওয়ার ফলে কেবল কার তার চলাচলের কোনো উপযোগিতাই নেই। অন্যেরা ঝড়-সাইক্লোনে নিরাপত্তার কথাও ভাবছেন। ফলে, জীর্ণ রাস্তার যানজটই এখনও তাদের নিয়তি।