বিশ শতকের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম রূপকার, ইলেক্ট্রোউইক ইউনিফিকেশন তত্ত্বের জনক ও নোবেলজয়ী স্টিভেন ওয়াইনবার্গ (১৯৩৩–২০২১) প্রকৃতি সম্পর্কে বলেছেন, ‘প্রকৃতির কথা ভাবলে একটা সৌন্দর্যের অনুভূতি জাগে, জাগে বিস্ময় আর রহস্যবোধ।’ জার্মান পদার্থবিদ ও লেখক স্টিফান ক্লেইন ২০০৯ সালে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেন, যা ডি জাইট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেই কথোপকথনের নির্বাচিত অংশে ফুটে উঠেছে এক বিজ্ঞানীর জীবনদর্শন, আবিষ্কারের আনন্দ এবং মহাবিশ্বকে বোঝার নিরন্তর প্রচেষ্টার স্বরূপ।
ক্লেইনের প্রশ্নের উত্তরে ওয়াইনবার্গ স্বীকার করেন, ১৯৬৭ সালে একটি লাল শেভ্রোলে কামারো চালিয়ে বোস্টনের রাস্তা দিয়ে অফিস যাওয়ার পথেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারের সূত্রপাত ঘটে। তিনি তখন পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে ধরে রাখা শক্তিশালী বল বোঝার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু বারবার তাঁর হিসাব একটি ভরহীন কণার অস্তিত্ব নির্দেশ করছিল, যা পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের বিপরীত। হঠাৎ করেই তিনি উপলব্ধি করেন, সেই কণাটি আর কিছু নয়, সুপরিচিত ফোটনই। ওয়াইনবার্গ বলেন, ‘আমার ধারণাগুলো সঠিক ছিল। তবে আমি যা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমস্যার ক্ষেত্রে সেগুলো প্রযোজ্য ছিল।’ তিনি শক্তিশালী বলের তত্ত্ব খুঁজতে গিয়ে পেয়ে যান আলো ও দুর্বল নিউক্লীয় বলের একীভূত ব্যাখ্যা। ক্লেইনের মতে, যেন এক গোয়েন্দা একটি অপরাধের সূত্র ধরে এগোতে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটির সমাধান করে ফেললেন।
ওয়াইনবার্গ এই প্রসঙ্গে তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের সৃজনশীল চিন্তার সঙ্গে সুরকার বা কবিদের তুলনা টানেন। তিনি বলেন, কাজের বিষয় নিয়ে সর্বদা নিমগ্ন থাকার ফলেই তিনি প্রায়ই ভুলে যান কোথায় গাড়ি পার্ক করেছেন বা কোন দোকানে কী কিনতে ঢুকেছিলেন। ক্লেইন উল্লেখ করেন, ওই উপলব্ধিই স্ট্যান্ডার্ড মডেলের জন্ম দেয়, যা এখন পদার্থের গঠন ও মহাবিশ্বের উৎপত্তির বহুল স্বীকৃত ধারণা। তবে ওয়াইনবার্গ জানান, তত্ত্বটি সঠিক প্রমাণিত হতে পরবর্তী ছয় বছর লেগেছিল এবং সেই প্রমাণ ছিল দ্বিতীয় পরম আনন্দের মুহূর্ত।
প্রকৃতির বিভিন্ন বলকে একীভূত করার আকাঙ্ক্ষার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওয়াইনবার্গ নিউটনের কথা স্মরণ করেন। নিউটন আবিষ্কার করেছিলেন যে পতনশীল পাথর ও গ্রহ, উভয়ই একই মহাকর্ষের আইন মেনে চলে। এটি আকাশ ও পৃথিবীর জন্য ভিন্ন নিয়মের ধারণা ভেঙে দিয়ে বিজ্ঞানের এক বিশাল অগ্রগতি ঘটায়। তবে ক্লেইন যুক্তি দেন যে একত্রীকরণের ফলে প্রাকৃতিক নিয়মের সংখ্যা কমলেও সেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। ওয়াইনবার্গ এটিকে দুঃখজনক সত্য বলে মেনে নিয়ে উদাহরণ দেন, সপ্তদশ শতকে নিউটনের তত্ত্ব বোঝা কঠিন হলেও এখন হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা তা সহজেই বোঝে।
একটি কণা ত্বরক প্রকল্প নিয়ে কংগ্রেসের সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে ওয়াইনবার্গ বিজ্ঞান ও জনসাধারণের মধ্যে ব্যবধানের হতাশার কথাও বলেন। এক কংগ্রেসম্যান তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, বড় কম্পিউটার থাকতে ত্বরকের দরকার কী? ওয়াইনবার্গ বলেন, ‘যে বিষয় সম্পর্কে কেউই কিছু জানে না, কম্পিউটার তার কিছুই হিসাব করতে পারে না।’ তিনি বিজ্ঞান শিক্ষায় বিপ্লবের পক্ষে মত দেন এবং বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু বলবিদ্যা ও গণিতের কঠিন পথে না ঠেলে, বরং মহান আবিষ্কারের গল্প শোনানোর মাধ্যমেও তাদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা উচিত। তবে এ লক্ষ্যে লেখা তাঁর বই পরিস্থিতি বদলাতে পারেনি।
পদার্থবিজ্ঞানের অগ্রগতি ও স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সাফল্য সত্ত্বেও ওয়াইনবার্গ স্বীকার করেন যে এই মডেল স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এর মধ্যে মহাকর্ষ অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি এবং কিছু সংখ্যাগত মান বাইরে থেকে জুড়ে দিতে হয়। তিনি একটি লাল বুকলেট বের করে দেখান, মৌলিক কণা সম্পর্কে জানা সব তথ্য এতে ভর্তি, যা দেখতে কুৎসিৎ। তাঁর মতে, ‘আমাদের কাজের ধরনের সঙ্গেই সৌন্দর্যবোধ মিশে আছে।’ একটি সুন্দর তত্ত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এমন একটি তত্ত্ব, যেখানে সংযোগগুলো অবধারিতভাবেই উঠে আসে। সবকিছু একে অপরের সঙ্গে মিলে যায়। আর আপনি যদি এর ছোট্ট একটি অংশও পরিবর্তন করার চেষ্টা করেন, তাহলে পুরো ইমারতই ভেঙে পড়বে।’ কোয়ান্টাম মেকানিকসের মতো তত্ত্বে এই সংগতি থাকলেও স্ট্যান্ডার্ড মডেলে তা নেই।
প্রকৃতি কেন এমন হবে যে মানুষ তার নিয়মকে সুন্দর মনে করে, এই প্রশ্নের উত্তর ওয়াইনবার্গের কাছে নেই। তবে তিনি বলেন, সৌন্দর্যের এই খোঁজ বিজ্ঞানকে অনেক দূর এনেছে এবং এটি বন্ধ করলে নতুন আবিষ্কারের সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যাবে। তাঁর কাছে এই অনিশ্চিত লক্ষ্যের পেছনে জীবন কাটানো সার্থক। তিনি ডেমোক্রিটাসের পরমাণু অনুমানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যা ২৩০০ বছর পর প্রমাণিত হয়েছিল। আজকের কণাপদার্থবিজ্ঞানের প্রকৃত অগ্রগতির জন্য প্রয়োজনের স্কেল আরও বিরাট, যা বর্তমান সক্ষমতার চেয়ে ১০১৭ গুণ বেশি শক্তির স্তরে গিয়ে অনুসন্ধান দাবি করে।
স্ট্যান্ডার্ড মডেল পরবর্তী ধাপের পথে বাধা কি না, এমন প্রশ্নে ওয়াইনবার্গ কোনো আফসোস প্রকাশ করেননি। বরং বলেন, এটি ছিল একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ। ‘সবকিছুর তত্ত্ব’ বা ‘থিওরি অব এভরিথিং’ শব্দবন্ধ তাঁর পছন্দ নয়, কারণ এতে পৌঁছালেও সব বোঝা যাবে না—যেমন চেতনা বা আবহাওয়া। তাই তিনি ‘ফাইনাল থিওরি’ বা চূড়ান্ত তত্ত্ব বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এর গুরুত্ব নিয়ে সংশয়কে তিনি অযৌক্তিক বলেন, কারণ এটি হবে সর্বত্র প্রযোজ্য এবং সব ব্যাখ্যার শেষ ধাপ, যেখানে গিয়ে সব ‘কেন’র সমাপ্তি ঘটে।
ক্লেইনের ম্যাট্রিওশকা পুতুলের রূপকের উত্তরে ওয়াইনবার্গ বলেন, ব্যাখ্যার ধাপগুলো ক্রমেই ব্যাপকতর হয়েছে, যা তাঁকে আশাবাদী করে। তবে মানুষের মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্নও রাখেন। একেশ্বরবাদ ও চূড়ান্ত তত্ত্বের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সম্পর্কের ধারণাকে তিনি উল্টো পিঠ থেকে দেখান: বহু-ঈশ্বরবাদের জটিলতা যেমন একেশ্বরবাদের জন্ম দিয়েছে, তেমনি পদার্থবিদরাও জটিল স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বদলে একীভূত ব্যাখ্যা চান। তিনি বলেন, ‘আমরা একই সঙ্গে সরলতা ও প্রাচুর্য—দুটিই চাই।’
শৈশবে লাইব্রেরিতে তাপীয় তত্ত্বের বইয়ে ইন্টিগ্রেশন চিহ্ন (∮) দেখার অভিজ্ঞতা ওয়াইনবার্গের কাছে ছিল জাদুকরি। তিনি ভেবেছিলেন, এ ধরনের প্রতীক বোঝা মানে প্রকৃতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে জয় করা। তাই নিজেই উচ্চতর গণিত শিখতে শুরু করেন এবং নিজেকে জাদুকরের শিক্ষানবিশ মনে হতো। সহকর্মীদের ঈর্ষা নিয়ে তিনি বলেন, পদার্থবিজ্ঞানে অর্জনের মূল্য নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কম থাকায় ঈর্ষা তেমন নেই। চীনা সহকর্মী লি ও ইয়াংয়ের নোবেলজয়ী আবিষ্কার ‘প্যারিটি ভায়োলেশন’ তাঁর নিজের পক্ষে করা সম্ভব ছিল ভেবে তিনি বিরক্ত হলেও ঈর্ষান্বিত হননি।
নোবেল পাওয়ার দিন স্ত্রীর মন্তব্য, ‘এখন তোমাকে এমন কিছু গবেষণাপত্র লিখতে হবে, যেগুলো খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়’, ওয়াইনবার্গের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি তাঁকে অতিরিক্ত প্রশংসার প্রভাব ও অমীমাংসিত প্রশ্নের চোরাবালি থেকে রক্ষা করেছিল। ফলে তিনি কণাপদার্থবিজ্ঞান থেকে মুখ ফিরিয়ে কসমোলজি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন, যা গুটিকয় বিশেষজ্ঞের আগ্রহ কাড়লেও তাঁকে প্রকৃতি সম্পর্কে নতুন কিছু শেখায়।
প্রকৃতির নিয়মের প্রতি ব্যক্তিগত ঈশ্বরের মতো আবেগ কাজ করে না বলে ওয়াইনবার্গ ‘ঈশ্বর’ শব্দটিকে জোর-জুলুম বলে মনে করেন। তাঁর বিখ্যাত বই ‘দ্য ফার্স্ট থ্রি মিনিটস’-এর সমাপ্তি বাক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মহাবিশ্ব যত বোধগম্য, ততই উদ্দেশ্যহীন মনে হয়—এখানে জীবনের কোনো বস্তুনিষ্ঠ অর্থ নেই। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এর মানে জীবন অর্থহীন নয়। বরং মানুষ একে অপরকে ভালোবেসে ও জগৎকে বোঝার চেষ্টা করেই নিজেদের অর্থ তৈরি করে নেয়। এই চেষ্টাই মানবজীবনকে ‘সস্তা প্রহসন’ থেকে ট্র্যাজেডির মর্যাদা দেয়। কেননা, মহাজাগতিক নাটকের চরিত্র ভাবার পরিবর্তে আমরা এখন কোনো নির্দেশনা ছাড়াই মঞ্চে দাঁড়ানো অভিনেতা, যাদের নিজেদেরই নাটক-কমেডি বানিয়ে নিতে হয়।




