বর্ষাকাল মানেই একদিকে যেমন প্রশান্তির বারিধারা ও চা-চক্র, তেমনি অন্যদিকে নাগরিক জীবনে জলাবদ্ধতার চেনা ছবি। ঢাকাসহ বিভিন্ন নগরীতে মুষলধারে বৃষ্টি নামলে সড়ক তলিয়ে যায়, এবং কর্মস্থল বা প্রয়োজনে বের হলে সেই পানি মাড়িয়ে চলা অনিবার্য হয়ে পড়ে। বাহ্যিকভাবে এটিকে সাধারণ বৃষ্টির পানি মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি নর্দমার ময়লা, পশুর মল, রাসায়নিক বর্জ্য ও বহুবিধ জীবাণুর মিশ্রণে তৈরি এক দূষিত তরল। অল্প সময়ের সংস্পর্শও সংক্রমণের কারণ হতে পারে। তাই বাসায় পৌঁছানোর পর কয়েকটি সাধারণ অভ্যাস আপনাকে বর্ষার নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।
সর্বপ্রথম, ঘরে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই পরিষ্কার পানি ও সাবান ব্যবহার করে পুরো শরীর ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। বিশেষ মনোযোগ দিন পা, হাত এবং শরীরের যেসব অংশ দূষিত পানির ছোঁয়া পেয়েছে সেগুলোতে। অনেকে কেবল পা ধোয়েন, কিন্তু পোশাক বা ত্বকের অন্যত্রও জীবাণু লেগে থাকতে পারে, তাই সম্ভব হলে সম্পূর্ণ গোসল করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।
দ্বিতীয়ত, পায়ের তলা, গোড়ালি ও আঙুলের ফাঁক ভালো করে দেখে নিন কোনো কাটা বা ক্ষত আছে কিনা। ঘোলা পানির আড়ালে ভাঙা কাচ, মরিচা পড়া ধাতব টুকরো বা ধারালো বস্তু লুকিয়ে থাকতে পারে, যা ছোটখাটো কাটা দাগও সৃষ্টি করতে পারে। ক্ষত দেখা গেলে পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে জীবাণুনাশক প্রয়োগ করুন, আর গভীর ক্ষতের জন্য দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
তৃতীয়ত, ভেজা কাপড়, মোজা ও জুতা বদলাতে দেরি করবেন না। দীর্ঘক্ষণ ভেজা পোশাক পরে থাকলে ত্বকে ছত্রাক সংক্রমণ, চুলকানি, র্যাশ ও বিব্রতকর গন্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়। ঘরে ঢুকেই শুকনো পোশাক পরে নিন এবং ব্যবহৃত মোজা বা জুতা ধুয়ে সম্পূর্ণ শুকিয়ে তবেই পুনরায় ব্যবহার করুন।
জলাবদ্ধ সড়কে ব্যবহৃত পাদুকা পরিষ্কার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জুতা বা স্যান্ডেলের তলায় জীবাণু আটকে থাকতে পারে, তাই সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে শুকিয়ে নিন, এবং চাইলে জীবাণুনাশক স্প্রে প্রয়োগ করতে পারেন। এতে ঘরের ভেতরে জীবাণুর বিস্তার কমবে।
বর্ষায় দূষিত পানির মাধ্যমে লেপ্টোস্পাইরোসিস, ডায়রিয়াসহ নানা ব্যাকটেরিয়াজনিত ও ভাইরাসঘটিত রোগ ছড়াতে পারে। জলাবদ্ধ পানিতে হাঁটার কয়েক দিনের মধ্যে যদি জ্বর, পেশিতে তীব্র ব্যথা, বমি, পাতলা পায়খানা, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, কিংবা ক্ষতস্থান লাল হয়ে ফুলে ওঠার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তবে জ্বর বা শরীর খারাপকে অবহেলা না করে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, প্রবীণ, শিশু ও যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম, তাদের জন্য একটি সামান্য ক্ষত থেকেও বড় ধরনের সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। তাই এসব ব্যক্তির বর্ষাকালে জলাবদ্ধ পানি যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত এবং প্রয়োজনে জলরোধী বুট ব্যবহার করা ভালো।
নিরাপদ থাকার জন্য আরও কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি: জলাবদ্ধতা পরিহারের চেষ্টা করুন, বাইরে থেকে ফিরে সাবান দিয়ে হাত-পা ধোবেন, ভেজা পোশাক দ্রুত বদলাবেন, ক্ষত পরিষ্কার ও শুকনো রাখবেন, টিটেনাস টিকা হালনাগাদ আছে কিনা নিশ্চিত হবেন এবং জ্বর বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখলে নিজে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন।
বর্ষার সৌন্দর্য মন ভরে উপভোগ করুন, কিন্তু নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা ভুলে গেলে চলবে না। ঘরে ফিরে কয়েক মিনিট ব্যয় করে শরীর পরিষ্কার, পোশাক বদল ও পায়ের যত্ন নেওয়ার মতো ছোট ছোট অভ্যাসই বড় সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে। মনে রাখতে হবে, বর্ষাকালে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধই হলো সচেতনতা, আর একটুখানি যত্নই আপনাকে ও আপনার পরিবারকে পুরো মৌসুমজুড়ে সুস্থ রাখতে পারে।




