সমুদ্রের গভীরে এক অদ্ভুত দীর্ঘকায় মাছের বসবাস, যা তার লম্বা ও চ্যাপটা শরীরের জন্য পরিচিত। বাজারে দেখলে প্রথমেই চোখে পড়ে এর অস্বাভাবিক দৈর্ঘ্য—মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত যেতে বেশ খানিকটা পথ পাড়ি দিতে হয়। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় ছুরি মাছ, ইংরেজিতে হেয়ারটেইল বা রিবনফিশ। নামকরণের পেছনেও শরীরের গঠনই দায়ী: ছুরির মতো চ্যাপটা ধারালো আকৃতি থেকে বাংলা নাম, আর চুলের মতো সরু লেজ থেকে ইংরেজি নাম। বিজ্ঞানীরা এই মাছকে ট্রাইকিউরিডি পরিবারে রেখেছেন। বাংলাদেশের উপকূলে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় লেপ্টুরাক্যান্থাস সাভালা বা ট্রাইকিউরাস লেপ্টুরাস প্রজাতি।
শরীরের এই লম্বাটে গঠন আসলে শিকার ধরার একটি বিশেষ কৌশলের ফল। ছুরি মাছ পানির মধ্যে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে—মাথা ওপরে, লেজ নিচে। এভাবে নিশ্চল থেকে চারপাশে নজর রাখে এবং ছোট মাছ বা চিংড়ি কাছে এলেই বিদ্যুতের মতো ছোবল দেয়। খাড়া হয়ে ভেসে থাকার জন্য লম্বা ও ফিতার মতো চ্যাপটা শরীর ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। পানিতে একটি লম্বা রুলার খাড়া রাখা যেমন সহজ, গোলাকার বস্তু তেমন নয়—একই যুক্তি ছুরি মাছের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
সাঁতারের ধরনটিও অন্য রকম। এই মাছের পাখনা বলতে গেলে নেই বললেই চলে; শুধু পিঠ বরাবর একটি লম্বা ও পাতলা পাখনা রয়েছে যা শরীরজুড়ে ঢেউয়ের মতো নড়ে—সাপের চলার ভঙ্গির মতো। এই নড়াচড়াকে বলা হয় আন্ডুলেটরি মুভমেন্ট, যা অত্যন্ত কম শক্তি খরচ করে দীর্ঘক্ষণ ভেসে থাকতে দেয়। আবার প্রয়োজনে হঠাৎ গতি তুলতেও সক্ষম। শরীর যত লম্বা, ঢেউ তোলার জায়গা তত বেশি, ফলে শক্তি সাশ্রয় হয়।
দিনের বেলা ছুরি মাছ সাধারণত পানির গভীরে—২০০ থেকে ৫০০ মিটার নিচে—অবস্থান করে, যেখানে আলো পৌঁছায় না। রাত নামলে খাবারের সন্ধানে ওপরে উঠে আসে। এই ওঠানামাকে ভার্টিক্যাল মাইগ্রেশন বলে। অন্ধকার পরিবেশে খাবার পাওয়া নিয়মিত নয়, তাই অনেকক্ষণ না খেয়ে টিকে থাকার সক্ষমতা জরুরি। লম্বা-পাতলা শরীরে পেশি কম থাকায় খরচও কম, ফলে কম খাবারে দীর্ঘদিন চলা সম্ভব। দাঁতের গঠনও বিশেষ—ছুঁচালো, বাঁকা ও ভেতরের দিকে হেলানো, যা শিকারকে মুখে নেওয়ার পর আর বের হতে দেয় না। ছোট মাছ, চিংড়ি, এমনকি নিজের প্রজাতির ছোট সদস্যও কখনো কখনো শিকার হয়।
ত্বকের গঠনও অনন্য। সাধারণ মাছের মতো শক্ত আঁশ নেই; বদলে আছে একটি পাতলা রুপালি আস্তরণ, যাকে গুয়ানিন স্তর বলে। এই স্তর মাছটিকে আয়নার মতো চকচকে করে তোলে, যা গভীর পানিতে ছদ্মবেশের কাজ করে। চারপাশের সামান্য আলো প্রতিফলিত হয়ে মাছটি পানির সঙ্গে মিশে যায়, ফলে শিকারি বা শিকার কেউই সহজে টের পায় না। তবে এই আস্তরণ খুব নরম, তাই বাজারে সাবধানে ধরতে হয়।
বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকেও ছুরি মাছের শরীর উল্লেখযোগ্য। লাখ লাখ বছর ধরে গভীর পানির অন্ধকার ও খাড়া হয়ে শিকার ধরার কৌশলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে শরীর এত লম্বা ও চ্যাপটা হয়েছে। পৃথিবীর ভিন্ন প্রান্তে বাস করা ইল মাছ বা বেল্ট মাছের সঙ্গেও এর দেহের মিল দেখা যায়, যদিও এদের মধ্যে সরাসরি আত্মীয়তা নেই। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে বলেন কনভারজেন্ট ইভোল্যুশন—ভিন্ন প্রজাতি আলাদা পথ ধরে একই সমাধানে পৌঁছানো।
বঙ্গোপসাগরের উপকূলে ছুরি মাছ একটি পরিচিত প্রজাতি। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও বরিশালের বাজারে সহজেই পাওয়া যায়। জেলেরা সাধারণত রাতের বেলা জাল দিয়ে ধরে, যখন মাছ খাবারের জন্য ওপরে উঠে আসে। দাম তুলনামূলক কম এবং কাঁটা কম থাকায় অনেকে ভাজা করে খেতে পছন্দ করেন। তবে সমুদ্রবিজ্ঞানীদের মতে, অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে কিছু অঞ্চলে এ মাছের সংখ্যা কমছে। বংশবৃদ্ধি দ্রুত হওয়ায় এখনো সংকটজনক নয়, তবে নজর রাখা জরুরি বলে মত বিশেষজ্ঞদের। সূত্র: ফিশ বেজ, সায়েন্স ডিরেক্ট, ফিজিকস ওয়ার্ল্ড।




