২০০৮ সালে মালয়েশিয়ার পেনাং বার্ড পার্কে প্রথম নজরে পড়ে নীলডানা হরবোলা নামের সবুজ পাখিটি। দেশের পাহাড়ি বনে এর বিচরণ থাকলেও খুঁজে পাওয়া ছিল দুরূহ। পিএইচডি শেষে ২০১০ সাল থেকে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনে পাখিটির সন্ধান শুরু করেন এক পক্ষীবিদ। ২০১২ সাল থেকে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আদমপুর বিট ও রাজকান্দি সংরক্ষিত বন, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, রেমা-কালেঙ্গা বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য ও কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ঘুরেও অধরা রয়ে যায় পাখিটি। ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩ সালে পুনরায় আদমপুরে গিয়ে টিলা থেকে ছড়ায় নামার স্থানে একটি ঝোপাল গাছে কিচিরমিচির শোনা গেলেও তির্যক সূর্যালোকের কারণে ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে এলো সাফল্য। সিলেটের কানাইঘাটের বড় হাওরে বিরল পাতিসারসের ছবি তোলার পর শ্রীমঙ্গল হয়ে আদমপুর, কুরমা ও বাইক্কা বিলে পাখি খুঁজতে যান তিনি। ২৪ জানুয়ারি সকালে আদমপুরে পৌঁছে বামন মাছরাঙার পুরোনো বাসার কাছে পৌঁছান। সেখান থেকে ছড়ায় নেমে প্রায় ১০ মিনিট হাঁটার পর তরুণ পক্ষীবিদ আব্দুল মজিদ শাহ শাকিল বাইনোকুলার দিয়ে একটি বিশাল গাছের পত্রগুচ্ছে সবুজ পাখি শনাক্ত করেন। দ্রুত ক্যামেরা স্থাপন করে ছবি তোলার পর নিশ্চিত হওয়া যায়—এটিই সেই দুর্লভ নীলডানা হরবোলা, যাকে দুই বছর আগে আদমপুরেই দেখা গিয়েছিল কিন্তু ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। গাছের পাতার আড়ালে শূককীট খুঁজতে থাকা পাখিটির আরও কয়েকটি ছবি তোলার পর বিরল চাঁদিয়ালের খোঁজে বনের গভীরে চলে যান দলটি। নীলডানা হরবোলা সবুজ বুলবুলি নামেও পরিচিত। ইংরেজিতে ব্লু-উইংড লিফ বার্ড। ক্লোরোপসিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Chloropsis moluccensis। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, চীন, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় দেখা যায়। দৈর্ঘ্য ১৫.৮-১৭.৭ সেন্টিমিটার ও ওজন ১৯.০-২৮.৫ গ্রাম। অন্যান্য হরবোলার মতো দেহের ভিত্তিরং পাতার মতো সবুজ। পুরুষের ঠোঁটের গোড়া থেকে নিচে বিস্তৃত গাঢ় নীল ত্রিভুজাকার কালো দাগ থাকে। গলা, মুখমণ্ডল ও মাথায় গাঢ় হলুদাভ আভা। ঘাড়ের পেছনে তামাটে আভা। কাঁধ, ডানার প্রান্তপালক ও লেজের পার্শ্বপালক উজ্জ্বল নীল। বুকের নিচ থেকে দেহতল লেবু সবুজ ও লেজ নীলচে। স্ত্রী পাখি পুরোপুরি সবুজ, কেবল গলায় ছোট নীলচে দাগ থাকে। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে চোখের মণি বাদামি থেকে লালচে বাদামি, ঠোঁট কালো, পা ধূসর ও নখ কালো। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে স্ত্রীর মতো হলেও গলা বেশি সবুজাভ, ডানায় নীল কম ও ঠোঁট ফ্যাকাশে। মিশ্র চিরসবুজ, পাতাঝরা, কুঞ্জবন ও বাগানে বিচরণ করে। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি বনে বাস করে। একাকী, জোড়ায় বা পারিবারিক দলে থাকে। ফুলের নির্যাস, ফল, কীটপতঙ্গ ও শূককীট খায়। তীব্র শব্দ ও শিস দিয়ে ডাকে, কাঠবিড়ালি ও অন্যান্য পাখির ডাক অনুকরণ করতে পারে। মে থেকে সেপ্টেম্বর প্রজননকাল। ভূমি থেকে ৬-১০ মিটার উঁচুতে সরু মূল, ঘাস ও আঁশের সঙ্গে মাকড়সার জাল জড়িয়ে বাটির মতো বাসা বানায়। ডিম পাড়ে দুই থেকে তিনটি। কালচে, বেগুনি ও লালচে বাদামি দাগসহ পীত বা পাটকিলে সাদা ডিম ১৩-১৪ দিনে ফোটে। মা-বাবা ১৫-১৮ দিন ছানা লালন-পালন করে। আয়ুষ্কাল চার বছরের বেশি।