কানাডার নায়াগ্রা জলপ্রপাতের নিকটবর্তী মেরিনল্যান্ড থিম পার্কটি ১৯৬০ সাল থেকে পরিচালিত হলেও ২০২৪ সালে সম্পূর্ণরূপে দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে পার্কটির বিরুদ্ধে বন্দী প্রাণীদের যথাযথ পরিচর্যার অভাব নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে পার্কটিতে ১৯টি বেলুগা ও একটি ওরকাসহ মোট ২০টি তিমির মৃত্যু হয়েছে। দর্শনার্থী সংখ্যা কমে যাওয়া, ব্যাপক সমালোচনা এবং ২০১৯ সালে কানাডায় তিমি ও ডলফিন বন্দী করে রাখা ও বংশবৃদ্ধি নিষিদ্ধ করে আইন পাস হওয়ার কারণে পার্কটি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে।
এক সময় চীনের একটি পার্কে তিমিগুলো বিক্রি করার চেষ্টা করা হলেও সেখানে তাদের খারাপ পরিস্থিতির শিকার হওয়ার আশঙ্কায় কানাডা সরকার তা নাকচ করে দেয়। এর জবাবে ২০২৫ সালের অক্টোবরে মেরিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষ হুমকি দেয় যে সরকার যদি সাহায্য না করে তবে তারা ৩০টি বেলুগা তিমিকে হত্যা করবে। অবশেষে গত মাসে কানাডা সরকার ও মেরিনল্যান্ডের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, তিমিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেনের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের অ্যাকুয়ারিয়ামে স্থানান্তর করে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই বিশাল আকৃতির প্রাণীগুলোকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিয়ে যাওয়া সহজ কাজ ছিল না। একটি পূর্ণবয়স্ক বেলুগা তিমি প্রায় ১৬ ফুট পর্যন্ত লম্বা এবং কয়েক হাজার পাউন্ড ওজনের হতে পারে। এই জটিল কাজটি সম্পাদনের জন্য পশুচিকিৎসক, পরিবহন বিশেষজ্ঞ, বিমান সংস্থা এবং সামুদ্রিক প্রাণী গবেষকদের কয়েক মাস ধরে যৌথ পরিকল্পনা করতে হয়েছে। তিমিগুলোকে প্রথমে বিশেষ ঝুলন্ত স্লিংয়ের সাহায্যে পানির ট্যাংক থেকে ট্রাকে তোলা হয়। এরপর সেগুলো টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে সরাসরি বিমানে করে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হয়। ভ্রমণের সময় তিমিগুলোর যাতে কোনো শারীরিক বা মানসিক কষ্ট না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। বিমানের ভেতরে পানির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, শ্বাসপ্রশ্বাস ও শারীরিক অবস্থা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ—প্রতিটি ধাপই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে সিয়েরা, অ্যাকাডিয়া, ওসাইরিস ও লিলুয়েট নামের তিমিগুলো শিকাগোর শেড অ্যাকুয়ারিয়ামে এবং বার্টি বটস ও ফ্র্যাঙ্কি টেক্সাসের সান আন্তোনিওর সি ওয়ার্ল্ডে পৌঁছে গেছে। মেরিনল্যান্ডে এখনো ২৪টি তিমি ও ২টি ডলফিন রয়েছে। শিকাগোর শেড অ্যাকুয়ারিয়াম জানিয়েছে, তারা মোট ১০টি তিমিকে নিয়ে এসে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, পরিষ্কার পানি ও সঠিক পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করবে। সি ওয়ার্ল্ড সান আন্তোনিও জানিয়েছে, তিমিগুলোর এখন সহায়তা প্রয়োজন এবং তারা সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। মেরিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষের দাবি, তিমিগুলোকে নতুন স্থানে সম্পূর্ণ সুস্থ ও নিরাপদে পৌঁছে দেওয়াই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
তবে কানাডার প্রাণী অধিকার সংস্থা অ্যানিমেল জাস্টিস এই পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ক্যামিল ল্যাবচাক জানান, মেরিনল্যান্ড কখনোই এই বুদ্ধিমান প্রাণীদের প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি ও তথ্য সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু বলেনি। স্থানান্তরের সময়ও তারা সেই গোপনীয়তার নীতি বজায় রেখেছে। কানাডার আইনে তিমিদের জোর করে কোনো প্রদর্শনীতে ব্যবহার করা বা বাচ্চা জন্মদানে বাধ্য করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই কানাডা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাকুয়ারিয়ামে যাওয়ার পর এই তিমিগুলোকে দিয়ে যেন কোনো বাণিজ্যিক সার্কাস বা লাভজনক প্রদর্শনী না করানো হয়, সে বিষয়ে সরব হয়েছেন প্রাণী অধিকারকর্মীরা।




