পাঙাশ চাষের একটি পুকুরে হাত দিলেই বোঝা যায় ব্যাপারটি কতটা ভিন্ন। পানি থাকে ঘোলাটে, প্রায় দুধ-চায়ের মতো বর্ণের, এবং সেই আবছা পরিবেশেই অগণিত মাছ গাদাগাদি করে চলাফেরা করে। নদীর স্বাভাবিক পরিবেশে এত ঘনত্বে কোনো মাছ টিকে থাকতে পারত না, দমবন্ধ হয়ে মারা পড়ত। অথচ পাঙাশের ক্ষেত্রে এই পরিণতি ঘটে না। বরং ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যেই এই আঁটসাঁট পুকুর থেকেই বের হয় বাজারের সবচেয়ে বড় আকারের এবং সবচেয়ে সাশ্রয়ী দামের মাছ। এর আসল রহস্য নিহিত রয়েছে এর দেহের একটি বিশেষ অঙ্গে।
সাধারণ মাছ ফুলকা ব্যবহার করে পানি থেকে অক্সিজেন টেনে নেয়, পানির অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে সেগুলো উপরের দিকে ভেসে ওঠে এবং ধীরে ধীরে মৃত্যু বরণ করে। পাঙাশের বেলায় এই সমস্যা দেখা যায় না। শিং, মাগুর ও কই মাছের মতোই এদের একটি অতিরিক্ত শ্বাসঅঙ্গ আছে, যদিও গঠনগতভাবে তা ভিন্ন। শিং মাছের বায়ুথলি, মাগুরের আর্বোরিসেন্ট অঙ্গ কিংবা কইয়ের ল্যাবিরিন্থের মতন, পাঙাশ তার মুখগহ্বরের কাছে অবস্থিত অঙ্গটির সাহায্যে সরাসরি বাতাস থেকে অক্সিজেন টেনে নিতে সক্ষম। অর্থাৎ, পুকুরের পানি যতই ঘোলা হোক এবং অক্সিজেনের পরিমাণ যতই কমুক না কেন, মাঝেমধ্যে জলের উপরে মুখ তুলে এক ঢোক বাতাস গ্রহণ করলেই তা চলতে পারে। এই সুবিধার কারণে চাষীরা একই জলাশয়ে হাজার হাজার মাছের পোনা ছাড়তে পারেন, যা রুই বা কাতলার ক্ষেত্রে করলে সব মাছ মারা পড়ার শঙ্কা থাকে। কম জায়গায় বেশি উৎপাদনই হল মূল কৌশল।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পাঙাশের খাদ্য হজমের অসাধারণ সক্ষমতা। এটি একটি সর্বভুক প্রাণী—শামুক, কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে পচা উদ্ভিদও খেয়ে সহজে পরিপাক করতে পারে। চাষের ঘেরে অবশ্য তাদের দেওয়া হয় বিশেষভাবে প্রস্তুত সম্পূরক খাবার, যেখানে প্রোটিনের মাত্রা ২৫ থেকে ৩২ শতাংশের মধ্যে রাখা হয়। খাবারের গুণগত মান যত উন্নত হয়, বৃদ্ধির হারও তত দ্রুততর হয়ে ওঠে। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রোটিনযুক্ত খাবার তো অনেক প্রজাতির মাছকেই দেওয়া হয়, তাহলে পাঙাশ কেন এতটা আলাদা? আসল তফাতটি লুকিয়ে আছে তার পাকস্থলী ও অন্ত্রের গঠন ও কার্যপ্রণালীতে। এগুলো এমনভাবে তৈরি যে খাবরের প্রায় পুরো অংশই দেহে রূপান্তরিত হয়ে যায়, অপচয় হয় খুবই সামান্য। একই পরিমাণ খাবারে একটি রুই মাছ যতটুকু ওজন অর্জন করে, পাঙাশ অনেক কম খেয়েই সেই ওজন স্পর্শ করতে পারে। খামারীরা এই হিসাবকে ফিড কনভার্সন রেশিও নামে অভিহিত করে থাকেন।
উষ্ণ আবহাওয়াও দ্রুত বৃদ্ধির আরেকটি প্রভাবক। মাছ শীতল রক্তের জীব হওয়ায় তাদের দৈহিক তাপমাত্রা পানির সাথে সাথে ওঠানামা করে। পানি গরম থাকলে বিপাকক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়, ফলে খাবার দ্রুত হজম হয়। বাংলাদেশের এপ্রিল-মে মাসের উষ্ণ জলরাশি পাঙাশের জন্য প্রায় আদর্শ একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে। এশিয়ার মেকং নদীর অববাহিকা যেখানে এই মাছের আদি আবাস, সেই অঞ্চলের আবহাওয়াও একই রকম উষ্ণ ও আর্দ্র। এই সাদৃশ্যের কারণেই সম্ভবত ভিয়েতনামের স্থানীয় এই প্রজাতি বাংলাদেশে এসে এত সহজে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে একটি মাছের পূর্ণাঙ্গ হতে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে, কিন্তু পাঙাশের ক্ষেত্রে সেই সময়সীমা নেমে আসে মাত্র ছয় থেকে আট মাসে। একটি ছোট পোনা থেকে প্রায় এক কেজি ওজনের মাছে পরিণত হওয়ার পুরো ঘটনাটি ছয় মাসের মধ্যেই সমাপ্ত হয়।
পাঙাশের এই ত্বরান্বিত উন্নতির পেছনে কেবল তার জৈবিক বৈশিষ্ট্যই দায়ী নয়, বরং চাষীর সুচিন্তিত কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রত্যেকটি একর জায়গার পুকুরে সুনির্দিষ্ট হিসাব করে পোনা ছাড়া হয়। ঘনত্ব খুব বেশি হলে বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, আবার খুব কম হলে জায়গার অপচয় ঘটে। দক্ষ চাষীরা তাই পানির রঙ এবং মাছের গতিবিধি দেখে বুঝতে পারেন কখন সম্পূরক খাবার বাড়াতে হবে আর কখন কমাতে হবে। শীতকালে যেমন মাছের খাওয়ার পরিমাণ কমে যায়, তখন খাবারের পরিমাণও কমিয়ে দিতে হয়, নতুবা পানি দুষিত হয়ে রোগজীবাণুর আক্রমণ দেখা দিতে পারে। প্রজননক্ষম মাছ বা ব্রুডস্টক বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও সজাগ দৃষ্টি রাখা হয়। যেসব পোনা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং সুস্থ থাকে, বৎসরের পর বছর তাদের থেকেই ডিম সংগ্রহ করা হয়—এটি এক ধীর কিন্তু অবিরত বাছাই প্রক্রিয়া, যাকে নির্বাচিত প্রজনন নামে আখ্যায়িত করা হয়। গত কয়েক দশক ধরে এই উপায়ে পাঙাশের এমন একটি জাত বিকাশিত হয়েছে, যা পূর্বের তুলনায় অনেক কম সময় ও খরচে পূর্ণ বাণিজ্যিক আকার লাভ করে।
তবে এত দ্রুত বর্ধনশীল এই মাছটি স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উপকারী, তা নিয়ে বিতর্কও আছে। প্রতি ১০০ গ্রাম পাঙাশে প্রায় ৮ থেকে ১০ গ্রাম চর্বি পাওয়া যায়, যার একটি অংশ স্যাচুরেটেড ফ্যাট। কিন্তু পুষ্টিবিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই মাছের প্রোটিনে উপস্থিত অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো অ্যাসিডের মাত্রা বেশ ভালো, পাশাপাশি এতে যথেষ্ট পরিমাণে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডও বিদ্যমান। ভবিষ্যতে যখনই থালায় পাঙাশ মাছ দেখবেন, একবার ভেবে দেখতে পারেন যে মাছটি ছয় মাস আগে ছিল আঙুলের সমান একটি ছোট্ট পোনা। যে বিশেষ অঙ্গটি তাকে অক্সিজেনবিহীন ঘোলা জলে বাঁচিয়ে রেখেছিল, সেটিই আজ এত সস্তায় এত বড় একটি মাছ আপনার পাতে এসে পৌঁছেছে। ছোট একটি শারীরবৃত্তীয় অভিযোজনই বাংলাদেশের অজস্র পুকুরের অর্থনীতির চিত্র বদলে দিয়েছে।


