বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নীলিমা ইসলাম বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে পিএইচডি করছেন। নিউইয়র্কের সিটি কলেজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নকালে তিনি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘দেবী’ উপন্যাসের ওপর একটি গবেষণা অভিসন্দর্ভ (থিসিস) রচনা করেন। অভিসন্দর্ভটির শিরোনাম ছিল ‘হুমায়ূন আহমেদ অ্যান্ড আর্কাইভাল হন্টিংস: দ্য সাবঅল্টার্ন এক্সপেরিয়েন্স অব দ্য নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান লিবারেশন ওয়ার অব বাংলাদেশ অ্যাজ পোট্রেইড ইন দেবী’।
নীলিমা ইসলামের জন্ম বাংলাদেশে হলেও পাঁচ বছর বয়সে তিনি পরিবারের সঙ্গে নিউইয়র্কে স্থানান্তরিত হন এবং সেখানকার পাবলিক স্কুল ও কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করেন। বাংলা ভালোভাবে পড়তে না পারার প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দাদার মৃত্যুর পর বাংলাদেশি সংস্কৃতির সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের তাড়না থেকে তিনি নিজে নিজে বাংলা শেখার উদ্যোগ নেন। এক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদের লেখাই ছিল তাঁর প্রথম পছন্দ। লেখকের স্পষ্ট ও সহজাত ভাষা তাঁকে যেমন অবাক করেছিল, তেমনি আত্মবিশ্বাসও জুগিয়েছিল। বর্তমানে প্রবাসে বাংলা শিখতে আগ্রহী তরুণদেরও তিনি হুমায়ূন আহমেদ পড়ার পরামর্শ দেন।
গবেষক জানান, ‘দেবী’কে থিসিসের বিষয় হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে কোনো পূর্বনির্ধারিত তাত্ত্বিক কাঠামো কাজ করেনি। তিনি উপন্যাসটিকে কোনো চিন্তাগত ছাঁচে ফেলতে চাননি; বরং লেখাটিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন যাতে সেটি নিজের বিশ্লেষণের পথ দেখায়। উপন্যাসটি তাঁকে বারবার থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করেছিল এবং প্রতিটি পাঠেই তিনি নতুন নতুন স্তর আবিষ্কার করেছেন। ফলস্বরূপ, পাঁচ দফায় অভিসন্দর্ভের খসড়া পুনর্লিখন করতে হয়েছে। এই প্রক্রিয়া তাঁকে শিখিয়েছে যে, সাহিত্যিক রচনাকে গভীর মনোযোগ দিয়ে বুঝতে চাইলেই প্রকৃত বিশ্লেষণ সম্ভব হয়।
তাঁর অভিসন্দর্ভ তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক রবার্ট হিগনি বিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ এবং বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে পূর্বপরিচিত ছিলেন না। ফলে নীলিমাকে উপন্যাস ও প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যার দায়িত্ব নিতে হয়। গবেষণার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ‘দেবী’কে নিছক বাংলাদেশি সমাজের প্রতিফলন না ভেবে বিশ্বসাহিত্যের মানদণ্ডে মূল্যায়নের গুরুত্ব তাঁরা উপলব্ধি করেন। জ্যাক দেরিদার মতো চিন্তাবিদ ও জাদুবাস্তবতার ধারণার সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের রচনাকে সম্পর্কিত করার প্রচেষ্টা প্রথমে তত্ত্বাবধায়কের সতর্কতার মুখোমুখি হলেও, শেষ পর্যন্ত উপন্যাসটির গভীরতা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল।
গবেষণার একটি কেন্দ্রীয় আবিষ্কার ছিল হুমায়ূন আহমেদের রাজনৈতিক নীরবতা সম্পর্কে ধারণার পরিবর্তন। প্রাথমিকভাবে এই নীরবতা একটি প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিলেও, নীলিমা ইসলাম পরে উপলব্ধি করেন যে, সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য না দিয়ে অর্থপূর্ণ শূন্যস্থান সৃষ্টি করাই লেখকের একটি সচেতন ও শক্তিশালী কৌশল। এই কৌশল পাঠককে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করে। তাঁর ভাষ্যে, ‘সাহিত্যে নীরবতাকে সব সময় অনুপস্থিতি ভেবে ভুল করা উচিত নয়। কখনো কখনো যা বলা হয়নি, সেটাই সবচেয়ে বড় অর্থ বহন করে।’ তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া নয়, বরং পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগানোই হুমায়ূন আহমেদের প্রধান শক্তি।
যদিও মাস্টার্সের পর তিনি আর কোনো একাডেমিক কাজ সরাসরি হুমায়ূন আহমেদকে কেন্দ্র করে করেননি, ‘দেবী’ নিয়ে কাজ করার সময় উত্থাপিত প্রশ্নগুলো এখনও তাঁর গবেষণাকে প্রভাবিত করে চলেছে। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় রচনা ‘দেবী’ সম্পর্কে নীলিমা ইসলামের মন্তব্য, হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত সরলভাবে গভীর কথা বলতে পারেন এবং বাস্তবতা ও রহস্যময়তার এক অনায়াস ভারসাম্য তৈরি করতে সক্ষম। এই গুণাবলিই বিভিন্ন পটভূমির পাঠকের কাছে তাঁকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে এবং তাঁর লেখাকে কালোত্তীর্ণ করে রেখেছে।




