ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ মানেই উত্তেজনার চরম মুহূর্ত। কিন্তু এই উত্তেজনা আপনার শরীরে কেমন প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণা চালিয়েছে জার্মানির বিলেফেল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাধারণ দিনের তুলনায় বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখার সময় একজন ভক্তের মানসিক চাপের মাত্রা প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়ে যায়। পাশাপাশি স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মানুষের হৃৎস্পন্দন যেখানে প্রতি মিনিটে গড়ে ৭০ দশমিক ৯ বার থাকে, ফাইনালের উত্তেজনায় তা বেড়ে ৭৮ দশমিক ৭ বার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তিন মাস ধরে জার্মানির আরমিনিয়া বিলেফেল্ড ক্লাবের ২২৯ জন ফুটবল ভক্তের ওপর এই গবেষণা পরিচালিত হয়। অংশগ্রহণকারীদের স্মার্টওয়াচ পরিয়ে তাঁদের হৃৎস্পন্দন ও মানসিক চাপের সূচক ধারাবাহিকভাবে রেকর্ড করা হয়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ম্যাচ শুরুর অনেক আগে থেকেই ভক্তদের মধ্যে চাপের প্রভাব শুরু হয়ে যায়। সকাল থেকে ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে এবং খেলা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এমনকি ম্যাচ শেষ হওয়ার পরেও ভক্তদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার চাপের লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়েছে।
ম্যাচ যেখানে দেখছেন, তার ওপর শারীরিক প্রভাবের যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। গবেষণা অনুসারে, যারা সরাসরি স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখেছেন, তাদের গড় হৃৎস্পন্দন ছিল প্রতি মিনিটে ৯৪ দশমিক ২ বার। অপরদিকে টেলিভিশনের সামনে বসা দর্শকদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৭৯ দশমিক ৪ বার। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রিয় দল গোল করার সময় স্টেডিয়ামে উপস্থিত ভক্তদের হৃৎস্পন্দন প্রতি মিনিটে ১০৮ বার পর্যন্ত ছুঁয়ে যেতে পারে, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কল্পনাতীত।
গবেষণায় অ্যালকোহলের প্রভাবও পরীক্ষা করা হয়েছে। যারা ম্যাচ দেখার সময় মদ্যপান করেছেন, তাদের হৃৎস্পন্দন অন্যদের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি ছিল। আর প্রিয় দল গোল করলে তা বেড়ে ১২ শতাংশে দাঁড়ায়। যদিও গবেষকরা সরাসরি কোনো চিকিৎসাঝুঁকি মূল্যায়ন করেননি, তবে তারা সতর্ক করেছেন যে আবেগপ্রবণ অবস্থায় অ্যালকোহল গ্রহণ কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ম্যাচের প্রথম কয়েক মিনিটে যখন ফলাফল অনিশ্চিত থাকে, তখন হৃৎস্পন্দন সবচেয়ে বেশি থাকে। খেলার অবস্থা নিশ্চিত হয়ে গেলে তা কিছুটা কমে আসে। তবে শেষ মুহূর্তে গোল হলে, যদিও দলের জয়ের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য, তবু ভক্তদের হৃৎস্পন্দন আবার চরমে ওঠে। গবেষকদের মতে, শরীর কেবল জয়-পরাজয়ের প্রতিই সাড়া দেয় না, বরং আশা, গর্ব এবং দলের প্রতি তীব্র আবেগের প্রতিও প্রতিক্রিয়া জানায়।
ফুটবল ম্যাচের এই ধরনের শারীরিক প্রভাব নতুন নয়। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ চলাকালে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, জার্মানির খেলা চলাকালে হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেড়ে যায়। পরবর্তী গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয়েছে যে, ম্যাচের সময় কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ বেড়ে যায়। যেসব ভক্ত নিজেদের দলের সাথে তীব্র মানসিক সংযোগ অনুভব করেন, তাদের মধ্যে এই প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বেশি।
এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখার আগে শুধু প্রিয় দলের জয় কামনা করাই যথেষ্ট নয়, বরং নিজের শরীরের প্রতিও নজর দেওয়া জরুরি। উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় শরীরকে শান্ত রাখতে গভীর শ্বাস নেওয়ার মতো কৌশল ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ফুটবলের আনন্দ যেন স্বাস্থ্যের ঝুঁকি হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।


