জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে সেই আন্দোলনের অর্জন ও ব্যর্থতা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটলেও পরবর্তী দুই বছরে জুলাইয়ের মূল চেতনা—রাষ্ট্র সংস্কার, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন—পূরণ হয়নি বলে মত প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।

স্বৈরাচারবিরোধী এই অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণরোষের ফল ছিল। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ একচ্ছত্র শাসনে গুম, খুন, বাকস্বাধীনতা হরণ ও সম্পদ লুটপাটের ঘটনা ঘটে। জুলাই আন্দোলন সেই নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা দেয়। আবু সাঈদ, ওয়াসিম, ইয়ামিন, মুগ্ধ, রিয়া, নাইমা—এসব তরুণ শহীদের আত্মত্যাগই আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রে ছিল। বৈষম্যবিরোধী ব্লকেডে রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও পুলিশের গুলির মুখে শিক্ষার্থীরা অকুতোভয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কারফিউ উপেক্ষা করে ১৯ জুলাই সংসদ ভবনের সামনে শুরু হওয়া মিছিল ২ আগস্ট শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। তবে ক্ষমতার শূন্যতায় দ্রুতই দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠী—যারা 'তৌহিদি জনতা' ও 'সাধারণ শিক্ষার্থী' নাম নিয়ে সংগঠিত হয়—সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাদের আক্রমণে নৃগোষ্ঠী, নারী, মাজার, বাউল ও সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ভাঙা হয় ভাস্কর্য ও শিল্প স্থাপনা, এমনকি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ভাস্কর্যও ধ্বংস করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে 'মব' সংস্কৃতি শুরু হয়, যার শিকার হন প্রথমে আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক ও পরে জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির শিক্ষকেরা।

জুলাইয়ে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের রাজনৈতিক দল গঠিত হলেও তারা এসব সহিংসতার বিরুদ্ধে নীরব থাকে। কেউ কেউ ধানমন্ডি ৩২ ভাঙচুরের মতো তাণ্ডবকে বৈধতা দেয়। অন্যদিকে, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা দেখা দেয়। পাশ্চাত্য সমর্থিত 'সুশীল বয়েজ ক্লাব' ঐকমত্য গড়তে ব্যর্থ হলেও উগ্র ডানপন্থীরা অরাজকতার মাধ্যমে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে। তরুণদের দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট বেঁধে ডান দিকে ঝোঁকে।

আওয়ামী লীগের বিদেশে অবস্থানরত নেতারা ও দেশে থেকে যাওয়া সমর্থকেরা জুলাইকে 'ডানপন্থীদের ষড়যন্ত্র' বলে অস্বীকার করে। তারা দাবি করে, আগের শাসনামলে তাদের ভালো ছিল। কিন্তু জুলাইয়ের শহীদ ও তাদের পরিবারের আহাজারি উপেক্ষিতই থেকে যায়। নানা বাধায় শহীদ-কন্যাদের স্মৃতির মিনারের ওপর থেকে কালো পর্দা সরেনি। অথচ জুলাইয়ের স্মৃতি জনগণের যৌথ চেতনায় গেঁথে আছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

জুলাই আন্দোলন শুধু শাসন বদল নয়, ছিল দেশ বদলের আকাঙ্ক্ষা। ১৯৭১ ও ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের পরও যা অধরা ছিল। কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক দল ও সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো গড়ে না ওঠায় সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা। তাঁর মতে, ডানপন্থার ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে এবং জুলাইয়ের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বামপন্থা থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। জুলাই আন্দোলনের পরও একই চক্রে আবর্তিত হচ্ছে দেশ—ক্ষমতা পাল্টালেও সরকারি দলের চুক্তি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে দলীয়করণের মতো পুরোনো অভ্যাস ফিরে এসেছে।

তবে জনগণের স্মৃতিতে জুলাই চিরকাল থাকবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ভোলাতে চাইলেও ইতিহাস দাগ কেটে বসে যায়। জুলাই শহীদ নাইমার মা এখনও উত্তরার মাইলস্টোন চত্বরে বসে কালো পর্দাঢাকা শহীদ মিনারের দিকে তাকিয়ে থাকেন—যা জুলাইয়ের অসমাপ্ত স্বপ্নের প্রতীক হয়ে আছে।