বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই মাস এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচনা করে। ওই বছরের ১ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটাপদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মিছিল-সমাবেশ শুরু করেন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামে পরিচিত এই প্রতিবাদ দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় দিন, ২ জুলাই রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা।

প্রতিবাদ চলাকালে ১৫ জুলাই এক বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা লাঠি, রড ও জিআই পাইপের মতো দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। এতে বহু শিক্ষার্থী আহত হন। এই হামলা প্রতিবাদকে আরও বেগবান করে এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলন আরও জোরালো হয়। রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও তৎকালীন সরকারদলীয় সংগঠনের হামলাও তীব্র হয়ে ওঠে।

পরবর্তী দিন, ১৬ জুলাই আন্দোলনে প্রথম প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সেদিন চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রংপুরে মোট ছয়জন নিহত হন। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান। তাঁর মৃত্যুর একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় তিনি দুই হাত প্রসারিত করে সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন এবং পুলিশ তাঁর বুকে পরপর গুলি করছে। এই দৃশ্য সারা দেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং আন্দোলনের গতিপথ আমূল বদলে দেয়। একই দিন চট্টগ্রামে ছাত্রদলের নেতা ওয়াসিম আকরাম, আসবাবশ্রমিক মো. ফারুক ও শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ এবং ঢাকায় নিউমার্কেট এলাকার হকার মো. শাহজাহান ও শিক্ষার্থী মো. সবুজ আলীও নিহত হন।

আবু সাঈদের মৃত্যুর পর সন্ধ্যায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ক্যাম্পাসে ছয়টি প্রাইভেট কার ও ১৩টি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ ওই দিনই বিশ্ববিদ্যালয়টি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে।

সরকার সেদিন দুপুর থেকে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়, যাতে হত্যাকাণ্ডের ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে না পড়ে। রাত থেকে ফেসবুকেও ধীরগতি দেখা দেয়। ওই দিনই দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন করা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান—এবং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয় এবং চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। তবে এসব পদক্ষেপ আন্দোলন দমাতে পারেনি; বরং প্রতিবাদ আরও বিস্তৃত হয়েছে।

ছাত্র-জনতার এই ব্যাপক আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সরকারি গেজেট অনুযায়ী, পুরো আন্দোলনে ৮৪৩ জন প্রাণ হারান এবং আহত হন বহু মানুষ। আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর সেই অমর দৃশ্য আজও ইতিহাসের পাতায় অমলিন হয়ে আছে।