ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান দুর্নীতি প্রতিরোধ, উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্য ও শিক্ষা খাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, সংসদ যদি দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষক না হয়, তাহলে বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি বিদায় নেবে বলে তিনি পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি পছন্দ-অপছন্দ ক্রিয়াশীল থাকে এবং কাউকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তাহলে দুর্নীতি দূর করা সম্ভব নয়। দুর্নীতির জন্য কেউ আমলা, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ রাজনীতিবিদকে দায়ী করলেও তিনি মনে করেন, এ দায় সবার। অর্থমন্ত্রীর আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তিনি সংসদ থেকে শুরু করে সর্বত্র তার প্রতিফলন দেখতে চান। ব্যাংক, বিমা ও স্টক মার্কেটে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে তিনি দুর্নীতিকে আর্থিক খাতের ‘শষে৴র ভূত’ হিসেবে অভিহিত করেন। কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আলাদাভাবে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব নয় বলে তিনি সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেন। প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরার বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘আপাতত দুর্নীতির হাত চেপে ধরেন, হাতের মধ্যে কড়া লাগায়ে দেন।’ তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে যদি এই দুর্নীতির সাথে আমিও জড়িত থাকি, ছাড় দেওয়া উচিত নয়।’ উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ এনে শফিকুর রহমান বলেন, সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি ইনসাফ করা হয়নি। সংরক্ষিত আসনের সরকারি দলের সদস্যদের বড় অঙ্কের ফান্ড দেওয়া হলেও বিরোধী দলের কাউকে তা দেওয়া হয়নি। তিনি বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে সুষম উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে সুষম বণ্টনের দাবি জানান, যাতে রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে সাধারণ জনগণ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। বিরোধী দলের আসনে সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে তিনি বিভেদ সৃষ্টির আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে মন্ত্রী ও সংরক্ষিত আসনের এমপিরা ভিন্ন ভিন্ন কথা বলায় বিভিন্ন এলাকায় বিভেদ তৈরি হচ্ছে বলে তিনি সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চান। সরকারি অর্থ অপচয় ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেদের নামফলক বসানোর প্রাচীন সংস্কৃতির কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকারি টাকায় কোনো ব্যক্তি বা রাজনীতিকের নামে স্থাপনার নামফলক বসানোর সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া উচিত। সরকার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শত শত কোটি টাকার সরকারি সম্পদ নষ্ট করে নামফলক পরিবর্তনের এই অপরাজনীতি দেশের জন্য চরম ক্ষতি ডেকে আনে। তিনি পরামর্শ দেন, কারও যদি নিজের নামের মোহ থাকে, তবে নিজের টাকা ও জমিতে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে নাম দিতে পারেন। জাতীয় সংসদকে ‘মজলুমের মিলনমেলা’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, সংসদের কার্যক্রম যত বেশি সুন্দর ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলবে, দেশের মানুষের মন থেকে হতাশা তত বেশি দূর হবে। সম্প্রতি একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিল পাসের প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিলটির ওপর মনের মতো করে বিস্তারিত আলোচনা ও অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বিরোধী দল বঞ্চিত হয়েছে, যা বেকারত্ব দূরীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জরুরি ছিল। সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বন্যায় নিহতদের পরিবারকে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার আহ্বান জানান। চট্টগ্রামের ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হওয়ায় সেখানে বিশেষ নজর দেওয়ার অনুরোধ করেন। ঢাকার পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও জলাবদ্ধতার তীব্র সমালোচনা করে তিনি ঢাকাকে দেশের ‘চেহারা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। বিদেশি অতিথিরা ঢাকা দেখেই পুরো দেশ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পান বলে তিনি বাজেটে ঢাকার জন্য বিশেষ বরাদ্দ ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রশংসা করে তিনি প্রাথমিক স্তরে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার কথা বলেন। তিনি মনে করেন, ধর্ম মানুষকে শালীনতা, দেশপ্রেম ও সৎ হতে শেখায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং অবহেলিত স্বতন্ত্র মাদ্রাসাগুলোর উন্নয়নে নজর দেওয়ার তাগিদ দেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সঠিক যোগ্যতার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করার অনুরোধ জানান।