বর্তমানে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে রান্নার পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কখন গ্যাস আসবে, কতক্ষণ থাকবে—এসব নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন অনেকেই। কেউ রাত জেগে রান্না করছেন, আবার কেউ একবার গ্যাস এলে একসঙ্গে কয়েক বেলার রান্না সেরে ফেলছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তুললে গ্যাসের অপচয় কমানো এবং সময় বাঁচানো সম্ভব।
প্রথমত, প্রেশার কুকারের ব্যবহার গ্যাস সাশ্রয়ে অত্যন্ত কার্যকর। মাংস, ডাল, ছোলা, আলু বা শক্ত দানাশস্য রান্নায় এটি ব্যবহার করলে খাবার দ্রুত সেদ্ধ হয় এবং গ্যাসের পরিমাণও কম লাগে। দ্বিতীয়ত, রান্নার আগে চাল, ডাল ও ছোলা কিছুক্ষণ পানিতে ভিজিয়ে রাখা জরুরি। চাল ২০-৩০ মিনিট, ডাল ৩০-৬০ মিনিট এবং ছোলা বা বড় দানার শস্য ৮-১০ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলে সেদ্ধ হতে সময় কম লাগে।
তৃতীয়ত, পাত্র অনুযায়ী বার্নার বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ছোট হাঁড়ির জন্য ছোট বার্নার এবং বড় হাঁড়ির জন্য বড় বার্নার ব্যবহার করা উচিত। শিখা যেন হাঁড়ির তলা ছাড়িয়ে বাইরে না বেরোয়, কারণ অতিরিক্ত শিখার তাপ বাতাসে ছড়িয়ে গ্যাসের অপচয় ঘটায়। চতুর্থত, রান্নার সময় হাঁড়ির ঢাকনা লাগিয়ে রাখলে তাপ ভেতরে আটকে থাকে, ফলে খাবার দ্রুত সেদ্ধ হয় এবং কম সময় গ্যাস জ্বালাতে হয়।
পঞ্চমত, সবজি ছোট টুকরা করে কাটলে তাপ দ্রুত ভেতরে পৌঁছায়। আলু, গাজর বা অন্যান্য সবজি ছোট করে কাটলে রান্নার সময় কমে, তবে অতিরিক্ত ছোট করলে পুষ্টিগুণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ষষ্ঠত, একসঙ্গে একাধিক খাবার রান্না করা যেতে পারে। প্রেশার কুকার বা স্টিমিং পদ্ধতিতে নিচে ডাল, ওপরে চাল বা সবজি রেখে একবারেই কয়েকটি পদ তৈরি করা সম্ভব।
সপ্তমত, বার্নার পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত জরুরি। বার্নারের ছিদ্র ময়লা বা কালিতে আটকে গেলে গ্যাস ঠিকভাবে পোড়ে না। শিখা নীলের বদলে হলুদ বা কমলা রঙের হলে বার্নার পরিষ্কার করা প্রয়োজন। অষ্টমত, রান্না শেষ হওয়ার একটু আগে চুলা বন্ধ করা উচিত। ভাত, খিচুড়ি, সেদ্ধ সবজি বা প্রেশার কুকারে রান্না করা ডাল চুলা বন্ধ করার পরও নিজের তাপে কিছুক্ষণ রান্না হতে থাকে।
নবমত, ফ্রিজ থেকে খাবার আগে বের করে রাখা ভালো। মাংস বা হিমায়িত খাবার রান্নার কিছু সময় আগে ফ্রিজ থেকে বের করলে স্বাভাবিকভাবে বরফ গলে যায়, ফলে রান্নার সময় কমে। তবে কাঁচা মাংস দীর্ঘক্ষণ ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখা উচিত নয়। দশমত, রান্নার পরিকল্পনা করে নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর। গ্যাস এলে কী কী রান্না করবেন তা আগে ঠিক করে রাখুন, সবজি কেটে রাখুন, মসলা বেটে রাখুন এবং উপকরণ হাতের কাছে রাখুন। একবারে কয়েক বেলার ডাল, ভাত বা মাংস রান্না করে ফ্রিজে সংরক্ষণ করলেও বারবার চুলা জ্বালানোর প্রয়োজন কমে।
এছাড়াও গ্যাসের সংকটে কিছু ভুল এড়িয়ে চলা জরুরি। গ্যাসের অপেক্ষায় চুলার নব খুলে রাখা উচিত নয়। খালি হাঁড়ি চুলায় বসিয়ে অপেক্ষা করা বা বারবার নব খোলাও ঠিক নয়। বার্নারের শিখা হলুদ বা কমলা হলে সেটি ব্যবহার চালিয়ে না গিয়ে পরিষ্কার বা পরীক্ষা করানো উচিত। প্রয়োজনের অতিরিক্ত এলপিজি সিলিন্ডার ঘরের ভেতরে মজুত না রাখাই ভালো।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল ই ইলাহী চৌধুরীর মতে, কম বা বেশি আঁচের পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস ব্যবহার করতে হবে। অল্প আঁচে রান্না করলে বেশি সময় লাগে এবং সেখানে গ্যাস আরও বেশি খরচ হতে পারে। আগুন নীলাভ কিনা তা লক্ষ রাখতে হবে; নীলাভ মানে গ্যাস ঠিকমতো পুড়ছে। বড় বার্নারে গ্যাস বেশি খরচ হয় বলে তিনি জানান।
সবশেষে, গ্যাস সাশ্রয়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো রান্নার পরিকল্পনা করা, প্রয়োজন অনুযায়ী আঁচ ব্যবহার করা এবং অযথা তাপের অপচয় না করা। শুধু কম আঁচে রান্না করলেই গ্যাস বাঁচে না—সঠিক পাত্র, সঠিক বার্নার এবং সঠিক পদ্ধতি ব্যবহার করলে একই পরিমাণ গ্যাসে আরও বেশি রান্না করা সম্ভব। শিখা যেন কখনোই হাঁড়ির তলা ছাড়িয়ে বাইরে না যায়, সেটাই মূল কৌশল।




