জীবনের কঠিনতম লড়াই শেষে স্বপ্ন জিইয়ে রাখা একদল যোদ্ধার অসামান্য কৃতিত্বকে স্বীকৃতি জানাতে আয়োজিত হলো 'ক্যান্সার সার্ভাইভার সম্মাননা প্রদান-২০২৬'। সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশন (সিসিসিএফ)-এর এই উদ্যোগের মঞ্চে শুধু পুরস্কারই বিতরিত হয়নি, বরং উঠে এসেছে সাহস, ধৈর্য আর বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণাময় আখ্যান। অনুষ্ঠানের সূচনায় ক্যানসারের সাথে লড়াই করে প্রয়াতদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে পুরো মিলনায়তনে এক মিনিটের নীরবতা পালিত হয়, যা হয়ে ওঠে বহু পরিবারের বেদনা ও অটুট বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি।

এরপর একে একে মঞ্চে সম্মাননা নেন জীবনের কাছে হার না মানা দশজন ক্যানসারজয়ী। ড. মারুফী খান, সেলিনা আহমেদ, মো. আবদুল গফফার, ফরিদা ইয়াসমিন, কাজী সুফিয়া আখতার, সিফাত আরেফিন প্রতীক, মনিরা ফারজানা আফরোজ তানিয়া, রায়না মাহমুদ, কানিজ হায়দার ও ফারজানা আলী লাবণী – প্রত্যেকের পেশাগত পরিচয় ভিন্ন হলেও সংগ্রামের দৃঢ়তায় তারা এক। কেউ উদ্যোক্তা হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, কেউ শিল্পচর্চায় নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন, আবার কেউ সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তাদের জীবনের বার্তা স্পষ্ট—মরণব্যাধি জীবনের শেষ অধ্যায় নয়, এটি একটমাত্র থেমে যাওয়ার কারণ নয়।

অনুষ্ঠানটির আরেক আবেগময় মুহূর্ত ছিল সাংবাদিক জান্নাতুল ফেরদৌসী মানুর বিশেষ সম্মাননা প্রাপ্তি। একজন কেয়ারগিভার হিসেবে তার মানবিক ভূমিকার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাবা-মা উভয়ই ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর তাদের পরিচর্যা করার বেদনাবিধুর অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর অদম্য প্রেরণা খুঁজে পান।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিক থেকে দেখাতে গিয়ে প্রধান অতিথি দেশের খ্যাতনামা অনকোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. এম. এ. হাই বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এমন বহু রোগী আছেন যাঁদের চিকিৎসার সুযোগ ফুরিয়ে গেলেও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি আত্মিক সংযোগের মাধ্যমে তাঁরা আশ্চর্যজনকভাবে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তিনি মানবজীবনে শরীর ও আত্মার চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

বিশেষ অতিথি অধ্যাপক ডা. হালিদা হানুম আখতার 'সার্ভাইভার'-এর পরিবর্তে 'ক্যানসার বিজয়ী' অভিধাটি ব্যবহারের ওপর জোর দেন। তার মতে, এঁরা শুধু বেঁচে থাকেননি, বরং দুরূহ লড়াইয়ে জিতেছেন। আরেক চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী নিজের স্ত্রীর ক্যানসার চিকিৎসাকালীন পরিচর্যাকারীর অভিজ্ঞতা ভাগ করে বলেন, এই লড়াই শুধু ডাক্তারের নয়, পরিবার, বন্ধু ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। সে কারণেই সিসিসিএফ-এর মতো সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ বাড়ছে।

সচেতনতাই যে এ রোগের মোকাবেলায় মূল অস্ত্র, তা বারবার ওঠে এসেছে বক্তার মুখে। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা সহজ ও খরচ কম হয় বলেও অভিমত দেওয়া হয়। স্বেচ্ছাসেবীদের অবদানকেও কৃতজ্ঞতা স্মরণ করা হয় আয়োজনে। 'ওয়ার্কশপ অন হাইজিন অ্যান্ড ফার্স্ট এইড', 'মেন্টাল ফার্স্ট এইড' এবং 'সোশ্যাল সার্ভিসেস গ্রান্ট অ্যাসিস্ট্যান্স' কর্মসূচির সদস্যদের হাতে সনদ তুলে দেওয়া হয়। মহাখালী ক্যানসার হাসপাতালের সরকারি অনুদানের আবেদন পূরণে নীরবে শ্রম দেওয়া স্বেচ্ছাসেবকদেরও বিশেষভাবে স্বীকৃতি জানানো হয়। মাত্র তিন বছরের পথচলায় সিসিসিএফ সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং ও 'এখানে থেমো না' বই প্রকাশের মাধ্যমে ক্যানসারের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলছে।

অনুষ্ঠান শেষে মিলনায়তনে ধ্বনিত করতালি যেন ছিল মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতি এক নিরলস শ্রদ্ধা। এই আয়োজন থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রতিটি ব্যক্তির মনের কোণে বাজছিল একটিই সুর—জীবনের সর্বোচ্চ পরিচয় রোগ নয়, লড়াই এবং সেই লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অফুরন্ত আশা।