চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়ন এখন কার্যত সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পরিণত হয়েছে। খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি আর অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এলাকার প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ। ভয়ে অনেকেই নিজের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। সম্প্রতি এলাকাটিতে ঘুরে দেখা গেছে, দিনের আলোতেই প্রকাশ্যে হামলার ঘটনা ঘটছে, অথচ কেউ প্রতিবাদ বা মামলা করার সাহস পাচ্ছে না।

গত ২৫ মার্চ মীরেরখীল বাজারের সড়কে ৭০ বছর বয়সী ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম তালুকদারকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে জখম করা হয়। দীর্ঘক্ষণ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পরও কেউ এগিয়ে আসেনি। পরদিন হাসপাতালে মারা যান তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুর আগে বেশ কয়েক দফায় তাঁর কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। তবে হত্যার পরও পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা করা হয়নি। নিহতের ছেলে জামাল উদ্দিন তালুকদার জানান, মামলা করলে কবর জিয়ারতের জন্যও নিরাপদে এলাকায় যাওয়া যাবে না বলে আত্মীয়রা পরামর্শ দিয়েছেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে এলাকায় সহিংসতা আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। খুন বা নিখোঁজ হওয়া অন্তত চার ব্যক্তির পরিবারও মামলা করেনি। তারা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, বাড়ি নির্মাণ, নতুন ব্যবসা শুরু বা প্রবাস থেকে ফেরা—এমন খবর পেলেই সন্ত্রাসীরা চাঁদা দাবি করে। টাকা না পেলে হামলা, অপহরণ এমনকি অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাও ঘটে।

এলাকায় অন্তত তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। পুরোনো দুটি গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন ‘গলাকাটা’ খ্যাত কামাল এবং গিয়াস-সাইফুল ভাইয়েরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে ফেরা আবুধাবি বিএনপির সভাপতি ইসমাইল হোসেন তালুকদারের অনুসারীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে নতুন একটি চক্র। এই তিন গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধও রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েই এসব গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।

সরফভাটার পশ্চিমাংশ, মীরেরখীল ও পাহাড়ঘেঁষা গ্রামগুলোর বহু মানুষ এলাকা ছেড়েছেন। স্থানীয় বিএনপি নেতা অধ্যাপক কুতুব উদ্দিন বাহার জানান, যাদের সামর্থ্য আছে তারা শহরে চলে গেছেন, বাকিরা চাঁদা দিয়ে-মাসোহারা দিয়ে সেখানেই থাকছেন। শুধু পশ্চিম সরফভাটার ১ থেকে ৪ নম্বর ওয়ার্ডেই প্রায় ৫০০ পরিবার এখন আর নিজের বাড়িতে থাকতে পারছে না বলে দাবি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের।

চিড়িংগা এলাকার বাজারটি প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ। সন্ধ্যা নামলেই ফাঁকা হয়ে যায় এলাকার পথঘাট। রাতে অপরিচিত কেউ দরজায় কড়া নাড়লেও কেউ দরজা খোলেন না। স্থানীয় এক নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁরা কোনো বিচার চান না, শুধু তাঁদের কথা যেন কোথাও প্রকাশ না করা হয়।

একটি ঘটনায় কাঠ ব্যবসায়ী মো. সেকান্দার আলীকে চাঁদা না দেওয়ায় ২০২২ সালে অপহরণ করে পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করা হয়। তিনি জানান, একপর্যায়ে নিজেকে মৃত ভেবেই ফেলে রেখে যায় তারা। দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণে বাঁচলেও এখনো নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেননি তিনি। হামলার পর থেকেই তাঁর ঘরে তালা ঝুলছে।

চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম অবশ্য দাবি করেছেন, সরফভাটার পরিস্থিতি এখন ‘মোটামুটি স্বাভাবিক’। তবে পাহাড়ি এলাকায় কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে বলেও স্বীকার করেন তিনি। দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ হিলাল উদ্দীন আহমেদ জানান, থানায় মাত্র ২২ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন, দুর্গম এলাকায় সব জায়গায় নিয়মিত টহল দেওয়া কঠিন। তবে সন্ত্রাসীদের ধরতে নিয়মিত অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।