সিলেট নগরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে বৃহস্পতিবার দুপুরে তোলামূল রহস্য উদ্ঘাটনের দাবিতে একটি মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। মিতালি আবাসিক এলাকা সমাজকল্যাণ সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে স্থানীয় বাসিন্দাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। সেখানে বক্তারা সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, একজন রঙের মিস্ত্রি এত কম সময়ে তিনজনকে হত্যা করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পারেন—এটি তাঁদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ বা আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে বলেও তাঁরা জোর দাবি জানান। আবদুস সাত্তারের নগরের লামাবাজার এলাকায় জায়গা আছে জানিয়ে বক্তারা বলেন, ওই জায়গা নিয়ে বিরোধের বিষয়েও অভিযোগ আছে। তাই হত্যাকাণ্ডের পেছনে সম্পত্তিসংক্রান্ত কোনো বিরোধ ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সিলেট শান্তিপূর্ণ নগরী। এই নগরে এ ধরনের রোমহর্ষ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অতীতে ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই। এ ঘটনায় আমরা ব্যথিত হয়েছি।’
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থলের পাশের একটি খালি প্লট থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি উদ্ধার করা হয়েছে। আটককৃত সন্দেহভাজন যুবক বাবুল মিয়া (৩৫)-এর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ এই অভিযান পরিচালনা করে। সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মঞ্জুরুল আলম বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মিতালি আবাসিক এলাকার একটি খালি প্লট থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, গত বুধবার সকালে রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত ব্যক্তিরা হলেন ওই বাসার বাসিন্দা আবদুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও তাঁদের গৃহপরিচারিকা তাহমিনা বেগম (২০)।
প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে বাবুল মিয়ার ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বাবুল রঙের মিস্ত্রির পাশাপাশি কসাইয়ের কাজ করেন। এর আগে তিনি আবদুস সাত্তারের বাসায় রঙের কাজ করেছিলেন। পুলিশ জানায়, গতকাল সকালে বাবুল ওই বাসায় যান। গৃহপরিচারিকা তাহমিনা দরজা খুলে দিলে তিনি ভেতরে ঢোকেন। সেখানে কোনো একটি বিষয় নিয়ে তাহমিনার সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বাবুল সঙ্গে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাহমিনাকে কোপান। তাঁর চিৎকার শুনে গেলে সুরাইয়া বেগম ও আবদুস সাত্তারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যার পর বাবুল বন্ধ ঘরের বারান্দা দিয়ে নেমে পালিয়ে যান বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাঁর অবস্থান শনাক্ত করা হয়। গতকাল বিকেলে রায়নগর এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনি থেকে তাঁকে আটক করা হয়।
সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মোহাম্মদ মাঈনুল জাকির বলেন, আবদুস সাত্তারের ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি দেশে ফিরছেন। তাঁর দেশে ফেরার পর লাশ দাফন ও মামলার বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। স্বজনেরা মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার বেলা একটায় পর্যন্ত থানায় কেউ লিখিত অভিযোগ দেননি বলে জানান অতিরিক্ত উপকমিশনার মঞ্জুরুল আলম।
মানববন্ধনে বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, বাসার মূল ফটক ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। খোলা ছিল গ্রিলহীন বারান্দার দরজা। এই অবস্থায় একজন ব্যক্তি তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে কীভাবে নির্বিঘ্নে পালাতে সক্ষম হলো—সে প্রশ্নও তুলেছেন তাঁরা।



