বিশ্বব্যাপী মহাকাশ নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢাললেও সে পথে হাঁটতে পারছে না ইউরোপ। রকেটের তীব্র ঘাটতি ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে মহাকাশভিত্তিক সামরিক প্রতিযোগিতায় তারা চরমভাবে পিছিয়ে পড়ছে। নরওয়ের অ্যান্ডোয়া স্পেসপোর্ট—যা আর্কটিক দ্বীপের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে নরওয়েজিয়ান সাগরের মুখোমুখি অবস্থিত—এখন ইউরোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎক্ষেপণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতাদের ধারাবাহিক সফর সেখানকার কৌশলগত গুরুত্ব স্পষ্ট করে। স্থানটি ইউরোপের জন্য মহাকাশে সামরিক শক্তি অর্জনের সম্ভাব্য সর্বশেষ আশা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
অ্যান্ডোয়া স্পেসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও নরওয়ের সাবেক ভাইস অ্যাডমিরাল কেটিল ওলসেন জানান, কক্ষপথে স্যাটেলাইট স্থাপনের সক্ষমতা নরওয়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সমগ্র ইউরোপের জন্য অপরিহার্য। তাঁর ভাষ্যে, এটি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, সার্বভৌমত্ব ও ইউরোপীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন। কিন্তু সেই লক্ষ্য এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। যোগাযোগ, পর্যবেক্ষণ ও অত্যন্ত সঠিক অবস্থান নির্ণয়ের জন্য স্যাটেলাইট বহু বছর ধরেই সামরিক প্রয়োজন। সম্প্রতি কক্ষপথস্থ ইন্টারসেপ্টর ও পরিদর্শন সিস্টেমের মতো নতুন অস্ত্রও সে পথে এগোচ্ছে। গত পাঁচ বছরে চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র কয়েক শ স্যাটেলাইট কক্ষপথে স্থাপন করেছে এবং পৃথিবী ও মহাকাশে অস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। এ কাজে তারা ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। অথচ এই তীব্র প্রতিযোগিতায় ইউরোপের অংশগ্রহণ নগণ্য। কারণ তাদের স্বার্থের সমন্বয়হীনতা, সীমিত জাতীয় বাজেট এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—পর্যাপ্ত ভারী উৎক্ষেপণ যানের অভাব। যেসব রকেট বছরে বহুবার কক্ষপথে পে-লোড পৌঁছে দিতে পারে, তা ইউরোপের কাছে নেই।
চীনের লং মার্চ ৫ ও রাশিয়ার প্রোটন-এম এবং আঙ্গারা এ৫ প্রতিটি ২৫ হাজার কিলোগ্রাম কক্ষপথে নিতে পারে। স্পেসএক্সের ফ্যালকন হেভি প্রায় ৬৪ হাজার কেজি বহনে সক্ষম। অন্যদিকে ফ্রান্সভিত্তিক আরিয়ানস্পেস এসএ-র আরিয়ান ৬ মাত্র ২২ হাজার কেজি বহন করতে পারে এবং এর বুস্টার উৎপাদন ও অবকাঠামো সীমিত থাকায় বছরে সর্বোচ্চ ১০টি উৎক্ষেপণ সম্ভব। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র গড়ে মাসে ১৫টির বেশি উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করেছে, যার নেতৃত্ব ছিল স্পেসএক্সের। এই ব্যবধান কমানো এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা এড়ানোই ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা। এর জন্য প্রয়োজন বিলিয়ন ইউরোর বিনিয়োগ।
ইউরোপের আশা জাগানো কয়েকটি স্টার্টআপ দ্রুত ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তবে এখন পর্যন্ত সফল উৎক্ষেপণের সংখ্যা হাতে গোনা। জার্মানির ইসার এরোস্পেস এসই-র ‘অনওয়ার্ড অ্যান্ড আপওয়ার্ড’ মিশন একাধিকবার স্থগিত হয়েছে এবং নতুন তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। এক বছর আগে মূল ভূখণ্ড ইউরোপ থেকে প্রথম কক্ষপথ উৎক্ষেপণের চেষ্টায় ইসারের রকেট মাত্র ৩০ সেকেন্ড উড়ে ভেঙে পড়ে। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা ড্যানিয়েল মেটজলার জানান, উৎক্ষেপণ স্থগিত রাখা ‘রকেট শিল্পেরই অংশ’, প্রতিটি চেষ্টা থেকে মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। তিনি আত্মবিশ্বাসী যে তারা কক্ষপথে পৌঁছাবে এবং নির্ভরযোগ্য প্রবেশাধিকার দেখাবে। কিন্তু ইসারের স্পেকট্রাম রকেটের পে-লোড ক্ষমতা মাত্র ১ হাজার কেজি, যা সামরিক প্রয়োজনে সীমিত।
এদিকে মহাকাশে হুমকি বাড়ছেই। গত দশকে স্নায়ুযুদ্ধের সময় যেসব সক্ষমতা অকার্যকর বা ব্যয়বহুল বলে মনে করা হতো, সেগুলো আবার দেখা দিচ্ছে। ভারত, চীন ও রাশিয়া ভূমি থেকে উৎক্ষেপিত অ্যান্টি-স্যাটেলাইট মিসাইল পরীক্ষা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ ২০০৮ সালে শিপ-লঞ্চড এসএম-৩ ব্লক আইআইএ মিসাইল দিয়ে স্যাটেলাইট ধ্বংস করেছিল, পরে তারা স্বেচ্ছায় এমন পরীক্ষা বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। ২০২১ সালে চীন কক্ষপথে একটি বস্তু পাঠায় যা পরে আরেকটি বস্তু মোতায়েন করে বা উৎক্ষেপণ করে এবং সেটি পৃথিবীতে ফিরে আসে। বিশ্লেষকদের মতে এটি সম্ভবত ফ্র্যাকশনাল অরবিটাল বম্বার্ডমেন্ট সিস্টেম (ফোবস) ছিল, যা পারমাণবিক ওয়ারহেডকে অপ্রত্যাশিত সময় ও দিকে আঘাত হানতে সক্ষম করে। চীন তার পরীক্ষায় হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল যুক্ত করে ধারণাটিকে আরও এগিয়ে নেয়। রাশিয়া স্নায়ুযুদ্ধের সময় কিছুদিনের জন্য ফোবস ব্যবস্থা চালু করলেও শেষ পর্যন্ত তা পরিত্যাগ করে।
তিন দেশই কক্ষপথে চালচলনে সক্ষম স্যাটেলাইট মোতায়েন করেছে, যা অন্য দেশের ব্যবস্থার কাছে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ বা নথিভুক্ত করতে পারে। গত এপ্রিলে তিন দেশের স্যাটেলাইট ‘পরিদর্শন’ জটিল নৃত্য শুরু হয়। একটি রুশ স্যাটেলাইট ভূ-স্থির কক্ষপথে তিনটি চীনা বাণিজ্যিক ও সামরিক স্যাটেলাইটের পাশে অবস্থান নেয়। এরপর একটি মার্কিন স্যাটেলাইট ওই রুশ স্যাটেলাইটের ১৩ কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসে। শেষে আরেকটি চীনা স্যাটেলাইট সেই ক্লাস্টারে যোগ দেয়। জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্তোরিয়াস জানান, গত শরতে দুটি রুশ লুচ-ওলিম্প গোয়েন্দা স্যাটেলাইট বুন্দেসভার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করেছে। তাঁর কথায়, মস্কো ও বেইজিংয়ের ‘স্যাটেলাইট নষ্ট, অন্ধ, কারসাজি বা ধ্বংস’ করার ক্ষমতা রয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে পুতিনের আগ্রাসনের প্রাক্কালে ভায়াস্যাট ইনক.-এর স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কে রুশ সাইবার হামলা জার্মানির হাজারো উইন্ড টারবাইন অচল করে দেয়। বার্লিন ২০৩০ সালের মধ্যে মহাকাশে প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ সক্ষমতায় ৩৫ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
দুই বছর আগে মার্কিন কংগ্রেসম্যান মাইক টার্নার জানান, রাশিয়া কক্ষপথে পারমাণবিক অ্যান্টি-স্যাটেলাইট অস্ত্র রাখার পরিকল্পনা করছে। ধারণা করা হয়, বড় যুদ্ধ শুরু হলে নির্দিষ্ট কক্ষপথের সব কিছু ধ্বংস বা অকার্যকর করতে একগুচ্ছ ডিভাইস বিস্ফোরিত হতে পারে। ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুত্তে এই দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। মিডলবেরি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জেফ্রি লুইসের ভাষ্যে, ‘যে বিশ্বে আমরা বাস করছি, সেখানে উৎক্ষেপণ সস্তা, তাই সব ধ্বংস করে প্রতিস্থাপন করাই বুদ্ধিমানের কাজ, যুদ্ধ হেরে যাওয়ার চেয়ে।’ কিন্তু ইউরোপের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ভিন্ন। উৎক্ষেপণ সস্তা নয়, বরং অপ্রতুল। আরিয়ানস্পেসের সাফল্যের রেকর্ড ও অ্যামাজনের লিও স্যাটেলাইটসহ পূর্ণ অর্ডার বুক থাকলেও তাদের উৎক্ষেপণ কেন্দ্র দক্ষিণ আমেরিকার ফ্রেঞ্চ গায়ানায় অবস্থিত, যা পৃথিবীর অর্ধেক পথ দূরে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে—যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ চান—এই অবস্থান কৌশলগতভাবে অনুকূল নয়। তাই মূল ভূখণ্ড ইউরোপে উৎক্ষেপণ সক্ষমতা গড়ে তোলার তাগিদ আরও জোরালো হয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলো সম্মিলিতভাবে এগোচ্ছে। জার্মানি, পোল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশ নিজস্ব প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পোল্যান্ড ফিনিশ স্টার্টআপ আইসাই থেকে ২০০ মিলিয়ন ইউরোতে তিনটি সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার স্যাটেলাইট কিনছে। যুক্তরাজ্য ৩.২ বিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ রেখেছে নতুন মহাকাশ সক্ষমতার জন্য এবং মে মাসে নকটিস-১ টেলিস্কোপের প্রথম ছবি প্রকাশ করেছে। ফ্রান্স ইওএক্স অরবিট পোর আন ডেমনস্ট্রাতের আগিল (ইওডিএ) নামে সংবেদনশীল স্যাটেলাইটের পাহারায় ছোট ‘বডিগার্ড’ ব্যবস্থা তৈরি করছে এবং স্থল বা মহাকাশে লেজার ব্যবহারের পরীক্ষা করছে। জার্মানির রকেট ফ্যাক্টরি অগসবার্গ (আরএফএ) এই গ্রীষ্মে শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের স্যাক্সাভোর্ডে সাবেক রাজকীয় বিমানবাহিনী ঘাঁটি থেকে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে। ইইউ ২০২২ সালে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার জন্য ইউরোপীয় মহাকাশ কৌশল প্রকাশ করে এবং IRIS২ ও GOVSATCOM নেটওয়ার্ক চালু করেছে। IRIS২-তে ২৯০টি স্যাটেলাইট একাধিক কক্ষপথে থাকবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পুরোপুরি চালু হওয়ার কথা। এটি স্টারলিংকের বিকল্প ও মার্কিন সমর্থন থেকে স্বাধীনতা আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। লুক্সেমবার্গের এসইএস এসএ, ফ্রান্সের ইউটেলস্যাট এসএ ও স্পেনের হিসপাস্যাট এসএ স্যাটেলাইটগুলো নির্মাণ করছে। ফরাসি সরকারের কৌশলগত গবেষণা ইনস্টিটিউটের ক্যাপ্টেন বিট্রিস হাইনো জানান, ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো মহাকাশ নজরদারি সক্ষমতায় বিপুল বিনিয়োগ করছে; কারণ সক্রিয় প্রতিরক্ষা বা আক্রমণ সক্ষমতার পাশাপাশি মহাকাশে প্রকৃত কী ঘটছে তা জানাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এখনো মূল প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। অ্যান্ডোয়া স্পেসের প্রধান নির্বাহী ওলসেন জানান, মূল ভূখণ্ড ইউরোপে কক্ষপথ উৎক্ষেপণের চাহিদা এত বেশি যে একাধিক স্পেসপোর্ট টিকতে পারে। প্রতি সপ্তাহেই নতুন উৎক্ষেপণ যান ও স্যাটেলাইট ব্রোকারদের কাছ থেকে ফোন আসছে। কিন্তু সবার আগে সফল উৎক্ষেপণের মাধ্যমে সেটি প্রমাণ করতে হবে। যতক্ষণ না তা হচ্ছে, ততক্ষণ ইউরোপের মহাকাশ সার্বভৌমত্ব অসম্পূর্ণ থাকবে এবং বাড়তে থাকা কক্ষপথীয় হুমকির মুখে তারা অসহায় অবস্থায় পড়বে।


