কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ১২ জুলাই ৭৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন। রাজধানী দোহার ইমাম মুহাম্মদ ইবন আবদ আল-ওয়াহাব মসজিদে মাগরিবের নামাজের পর কোনো আনুষ্ঠানিক জাঁকজমক ছাড়াই তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমান আমির ও তাঁর পুত্র শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যরা জানাজায় অংশ নেন। এরপর মরদেহ দোহার উত্তরপ্রান্তে লুসাইল কবরস্থানে দাফন করা হয়।
ক্ষমতায় আসার আগেই শেখ হামাদ উপলব্ধি করেছিলেন যে ভৌগোলিকভাবে ছোট এই রাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের জন্য সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির পরিবর্তে ‘সফট পাওয়ার’-এ বিনিয়োগ অপরিহার্য। তাঁর শাসনামলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ক্রীড়াক্ষেত্রে বিশাল বিনিয়োগ করা হয়। কাতারের জ্বালানি সম্পদ কেবল অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
শেখ হামাদের নেতৃত্বেই কাতার আল উদেইদ সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে, যা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। একইসঙ্গে দোহায় হামাস নেতৃত্বকে আশ্রয় দেওয়ার মতো কৌশল গ্রহণ করে দেশটি। এই দ্বৈত অবস্থান কাতারকে সংঘাতের সব পক্ষের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখার সক্ষমতা এনে দেয়।
পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে হর্ন অব আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে জটিল বিরোধ ও সংঘাত নিরসনে কাতারের মধ্যস্থতামূলক ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ২০০৮ সালে দোহা লেবাননের নেতাদের একত্র করে ঐতিহাসিক একটি চুক্তি সম্পাদনে সহায়তা করে, যা দেশটিকে আরেকটি গৃহযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করে। দারফুর সংকট নিয়ে সুদানের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ৩০ মাস ধরে চলা আলোচনার পৃষ্ঠপোষকতা করে কাতার, যার ফলে ২০১১ সালে ‘দোহা ডকুমেন্ট ফর পিস’ স্বাক্ষরিত হয়।
ফিলিস্তিনের বিভক্ত দুটি পক্ষ হামাস ও ফাতাহর মধ্যে সংলাপ অব্যাহত রাখতেও পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে কাতার। ২০১২ সালে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের পর গাজা উপত্যকা সফরকারী প্রথম আরব নেতা ছিলেন শেখ হামাদ। ওই সময় তিনি ৪০ কোটি ডলারের আবাসন ও পুনর্গঠন প্রকল্পের ঘোষণা দেন। এছাড়া ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এই অঞ্চলের জনগণের স্বাধীনতা ও মর্যাদার পক্ষে অবস্থান নেয় কাতার।
শেখ হামাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে ২০১৩ সালে তিনি সিংহাসন থেকে সরে দাঁড়ান এবং তাঁর পুত্র শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির হাতে দায়িত্ব অর্পণ করেন। শেখ তামিম বাবার দেখানো পথেই দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন। ইয়েমেন, সোমালিয়া, ইরিত্রিয়া ও জিবুতির মধ্যকার বিরোধ মীমাংসায় কাতারের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।



