আগারগাঁওয়ে অবস্থিত জাতীয় গণগ্রন্থাগারের নিচতলার লবিতে চলছে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের নকশা করা ভবনগুলোর একটি বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনী। লবির মাঝে স্টিলের কাঠামোতে বড় আকারের ছবিগুলো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যেখানে দেশের বিভিন্ন এলাকার ভবন ফুটে উঠেছে। কিছু ভবন পরিচ্ছন্ন অবস্থায় দেখা গেলেও অনেকগুলোর চারপাশে গাছপালা বেড়ে উঠেছে, যা লাল ভবন আর সবুজ পরিবেশের এক কাব্যিক দৃশ্য তৈরি করেছে। স্থপতি ও আলোকচিত্রী নিকলাউস গ্র্যাবারের তোলা এসব ছবিতে স্থাপত্যের নান্দনিকতা ও সৌন্দর্যবোধের সমন্বয় ঘটেছে।
‘স্পেসেস অব বিলঙ্গিং’ শীর্ষক এই প্রদর্শনীটি মূলত স্থপতি মাজহারুল ইসলামের ওপর নিকলাউস গ্র্যাবারের গবেষণামূলক বই ‘স্পেসেস অব বিলঙ্গিং: দ্য আর্কিটেকচার অব মাজহারুল ইসলাম’-এর অংশ। বইটি গত বছর লুসার্নের কোয়ার্ট ভারলাগ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রদর্শনীতে দেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ মাজহারুল ইসলামের ১০টি বিখ্যাত স্থাপনা প্রকল্পের ২৪টি ছবি স্থান পেয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্থপতি মাজহারুল ইসলাম আর্কাইভ এই প্রদর্শনীর আয়োজনে সহায়তা করছে। আর্কাইভের তত্ত্বাবধায়ক সহযোগী অধ্যাপক মুহতাদিন ইকবাল জানান, এই ছবিগুলো নিয়ে মোট ১০টি প্রদর্শনীর পরিকল্পনা রয়েছে, যেগুলো স্থপতির নকশা করা স্থাপনাগুলোতে অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় গ্রন্থাগারে এটি দ্বিতীয় প্রদর্শনী, যা ৮ আগস্ট শুরু হয়ে আগামীকাল ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার শেষ হবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
এর আগে ঢাকায় ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশে গত ২৫ এপ্রিল বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকরা জানান, পর্যায়ক্রমে সুবিধামতো সময়ে বাকি প্রদর্শনীগুলো করা হবে। তৃতীয় প্রদর্শনী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং চতুর্থটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রদর্শনীতে স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে নিয়ে লেখা নিকলাউস গ্র্যাবারের বইটিও প্রদর্শন করা হচ্ছে। প্রদর্শনীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, বাংলাদেশ সড়ক গবেষণাগার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় জনপ্রশাসন ইনস্টিটিউট (নিপা), কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার, জাতীয় গ্রন্থাগার ও আর্কাইভ, বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট (বগুড়া, পাবনা, রংপুর, সিলেট ও বরিশাল) — এই ১০টি প্রকল্পের ছবি রয়েছে।
স্থপতি মাজহারুল ইসলাম (১৯২৩-২০১২) সম্পর্কে নিকলাউস গ্র্যাবার মন্তব্য করেন, তিনি তাঁর কাজে বাংলাদেশে এমন এক অসামান্য স্থাপত্য ঐতিহ্য রেখে গেছেন, যার প্রাসঙ্গিকতা সময় ও ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূরে পৌঁছেছে। তাঁর যুগান্তকারী ও কালজয়ী কাজগুলোতে তিনি বাস্তববাদ ও কাব্যিকতার এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য স্থাপন করতে পেরেছেন। নিকলাউস গ্র্যাবার দীর্ঘদিন ধরে স্থপতি মাজহারুল ইসলাম ও বাংলাদেশের স্থাপত্যকর্ম নিয়ে গবেষণা করছেন।
বইটিতে তাঁর কাজের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশ্লেষণমূলক আলোচনার পাশাপাশি বহু আলোকচিত্র এবং মূল নকশার বিস্তারিত প্রতিলিপি উপস্থাপন করা হয়েছে। সুইস স্থপতি নিকলাউস গ্র্যাবার ইটিএইচ জুরিখ এবং নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি সুইজারল্যান্ডের লুসার্নের ‘গ্র্যাবার অ্যান্ড স্টাইগার আর্কিটেক্টস’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং লুসার্ন ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস অ্যান্ড আর্টসে শিক্ষকতা করেছেন। ঢাকার বেঙ্গল ইনস্টিটিউট ফর আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপ অ্যান্ড সেটেলমেন্টসেও কর্মশালা পরিচালনা করেছেন তিনি। বাংলাদেশের স্থাপত্যজগতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে গবেষণার জন্য তিনি বহুবার বাংলাদেশ সফর করেছেন এবং আন্তর্জাতিকভাবে এ বিষয়ে প্রকাশনা ও বক্তৃতা দিয়ে আসছেন।




