নারীর প্রজননক্ষমতা বয়সের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। চিকিৎসকদের মতে, সন্তান ধারণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়স। এর পরে প্রজননক্ষমতা ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে শুরু করে, আর ৩৫ বছর পেরোলে এই পতন আরও দ্রুত হয়। পান্থপথের ঢাকা ফার্টিলিটি সেন্টারের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মারুফ সিদ্দিকী জানান, চিকিৎসাবিজ্ঞানে ৩৫ বছরের পরের সময়টিকে ইনফার্টিলিটির জন্য 'রেড সিগন্যাল' হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ, এই বয়সে সন্তান নিতে চাইলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা জরুরি, কারণ সময় সীমিত হয়ে আসে।

তবে বর্তমানে অনেক নারীই ৪০ বছর বা তার কাছাকাছি বয়সে সন্তান ধারণের আগ্রহ নিয়ে বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হচ্ছেন। এর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে—কেউ পেশাগত কারণে দেরিতে বিয়ে করেছেন, কেউ প্রথম বিয়ে ভেঙে নতুন সংসার শুরু করেছেন, আবার কারও প্রথম সন্তান অসুস্থ বা মৃত্যুবরণ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সন্তান ধারণের সম্ভাবনা নির্ধারণের আগে কিছু প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা আবশ্যক বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রথম ধাপে পরীক্ষা করে দেখা হয় প্রজননক্ষমতার সঙ্গে জড়িত অঙ্গগুলো—জরায়ু, ডিম্বাশয় এবং ফেলোপিয়ান টিউব—সুস্থ আছে কি না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণুর মজুদ কতটুকু আছে, অর্থাৎ ওভারিয়ান রিজার্ভ কেমন। রিজার্ভ ভালো থাকলে ৪০ বছর বয়সেও নারীর প্রজননক্ষমতা মোটামুটি ভালো থাকতে পারে এবং সেক্ষেত্রে সাপোর্টিভ চিকিৎসা দিয়ে ফল পাওয়া সম্ভব। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা কমতে কমতে একসময় শেষ হয়ে যায়, যাকে মেনোপজ বলে। তখন আর কোনো চিকিৎসা কার্যকর হয় না।

ওভারিয়ান রিজার্ভ যাচাইয়ের জন্য এন্ট্রাল ফলিকল কাউন্ট (এএফসি) বা এএমএইচ নামক রক্ত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উল্লেখ্য, বয়সভেদে এই রিজার্ভের তারতম্য দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম বয়সেই ডিম্বাণুর সংখ্যা কমে যেতে পারে, আবার ৪০ বছর বয়সেও অনেকের ডিম্বাণুর মজুদ ভালো থাকে। যাদের রিজার্ভ ভালো, তাদের যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো ফলাফল অর্জন সম্ভব। প্রায়ই এমন ক্ষেত্রে আইইউআই বা আইভিএফ-এর মতো উন্নত চিকিৎসাপদ্ধতির প্রয়োজন পড়ে।

৪০ বছর বা তার কাছাকাছি বয়সে সন্তান ধারণের পরিকল্পনা করলে জীবনযাপনে কিছু প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। যারা স্থূল, তাদের ওজন কমানো জরুরি। ডায়াবেটিস, থাইরয়েড সমস্যা বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে আগে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে চর্বিযুক্ত ও ফাস্টফুড বাদ দিয়ে ফলমূল ও ভিটামিনসমৃদ্ধ স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে। ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহারও সন্তান ধারণের সম্ভাবনা বাড়ায়।

যারা বর্তমানে সন্তান নিতে চান না বা নিতে পারছেন না, কিন্তু বয়স ৩৫ ছাড়িয়ে গেছে, তাদের জন্য ডিম্বাণু বা ভ্রুণ সংরক্ষণের পদ্ধতি বেশ কার্যকর। বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এই পদ্ধতিতে আইভিএফ-এর মাধ্যমে তৈরি ভ্রুণ হিমায়িত করে রাখা হয়, যা পরবর্তীতে ব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশেও এই সুবিধা রয়েছে। কারণ, বয়স বাড়ার পর ভালো মানের পর্যাপ্ত ডিম্বাণু না পাওয়ার কারণে আইভিএফ সফল নাও হতে পারে।

চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে গর্ভধারণে কিছু ঝুঁকি বাড়তে পারে, যেমন গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, প্রি-একলাম্পসিয়া বা সন্তানের জন্মগত ত্রুটি। তবে আধুনিক চিকিৎসায় এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে। তাই হতাশ না হয়ে একজন ফার্টিলিটি স্পেশালিস্টের পরামর্শ নিয়ে সম্ভাবনা যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়াই উত্তম পথ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।