নবজাতক শিশুদের মস্তিষ্কে পিতার শরীরের স্বাভাবিক সুবাস এক শক্তিশালী ইঙ্গিত হিসেবে কাজ করে—এমনই এক চমকপ্রদ আবিষ্কারের কথা জানিয়েছে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান। সায়েন্স অ্যাডভান্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট ফর লার্নিং অ্যান্ড ব্রেইন সায়েন্সেসের গবেষক ইয়ারা এন্ডেভেল্ট-শাপিরা। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র অলফ্যাকশন, অর্থাৎ মানুষের ঘ্রাণশক্তি কীভাবে কার্যকর হয়, তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ।

মানুষের গন্ধকে শাপিরা এক ধরনের নীরব ভাষা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মুখে কোনো কথা উচ্চারণ না করলেও শরীরের প্রাকৃতিক ঘ্রাণের মাধ্যমে আমরা পরস্পরের সঙ্গে নিরন্তর তথ্য বিনিময় করি। পূর্বে তিনি মাতৃগর্ভ ও জন্মোত্তর সময়ে মা ও শিশুর মধ্যে গন্ধের যে ঘনিষ্ঠ শারীরিক ও মানসিক সম্পর্ক রয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতার সূত্র ধরে তাঁর মনে প্রশ্ন ওঠে—পিতা ও সন্তানের মধ্যেও কি একই ধরনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে?

বর্তমানে শিশুদের দেখভাল ও লালনপালনে পিতারা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু জীবনের একেবারে শুরুর দিকে এই বিকাশে পিতার উপস্থিতি বা তাঁর ভূমিকার পরিমাণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না। এই ঘাটতি পূরণে শাপিরা ও তাঁর দল একটি অভিনব পরীক্ষার পরিকল্পনা করেন। পরীক্ষায় প্রতিটি শিশুকে তিনটি ছোট কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি ছিল শিশুর নিজের পিতার সঙ্গে, বাকি দুটি সম্পূর্ণ অপরিচিত দুজন পুরুষের সঙ্গে। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক কৌশল প্রয়োগ করা হয়। অপরিচিত দুজনের একজনকে পরতে দেওয়া হয় শিশুর পিতার আগে পরিহিত একটি পোশাক, যাতে পিতার শরীরের গন্ধ লেগে ছিল। অন্যজনকে দেওয়া হয় একেবারে নতুন, পরিষ্কার ও গন্ধহীন একটি পোশাক। শিশুদের কাছে যেন কোনো নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা তৈরি না হয় বা তারা অভ্যস্ত হয়ে না পড়ে, সেজন্য এই তিনটি মিথস্ক্রিয়ার ক্রম সম্পূর্ণ এলোমেলোভাবে সাজানো হয়েছিল।

সামাজিক যোগাযোগের সময় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপ নিখুঁতভাবে মাপার জন্য তাঁদের মাথায় বিশেষ এক ধরনের যন্ত্র বসানো হয়। গবেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, যন্ত্রটি দেখতে অনেকটা গোসলের সময় পরিধান করা টুপির মতো, যার চারপাশ দিয়ে অসংখ্য তার ও ইলেকট্রোড বেরিয়ে ছিল। এই আধুনিক সরঞ্জামের কাজ হলো সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার সময় মস্তিষ্ক কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করছে, তা পরিমাপ করা।

পরীক্ষার ফল বিজ্ঞানীদের রীতিমতো অবাক করে। তাঁরা দেখেন, পিতা সরাসরি শিশুর সামনে উপস্থিত থাকলে শিশুর মস্তিষ্কের কার্যকলাপ অনেক বেশি ছন্দোবদ্ধ ও সমন্বিত হয়ে ওঠে। কিন্তু সবচেয়ে বড় চমক অপেক্ষা করে পরবর্তী ধাপে। যখন সেই অপরিচিত ব্যক্তি শিশুর সামনে আসেন, যার গায়ে ছিল শিশুর পিতার পরিহিত পোশাকটি, তখনও শিশুর মস্তিষ্ক ঠিক একইভাবে কাজ করতে থাকে। অর্থাৎ, কেবল পিতার গায়ের গন্ধ পেয়েই শিশু অপরিচিতজনকেও নিজের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কেউ হিসেবে গ্রহণ করে, এবং মস্তিষ্কের তরঙ্গগুলো একই ছন্দে স্পন্দিত হতে থাকে।

এই গবেষণার ফল একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—নবজাতকরা তাদের পিতার শরীরের গন্ধ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চিনতে পারে। পিতার সুবাস শিশুর কাছে একটি শক্তিশালী সংবেদনশীল সংকেত হিসেবে কাজ করে। এমনকি পিতা শারীরিকভাবে শিশুর সামনে উপস্থিত না থাকলেও, কেবল তাঁর গায়ের গন্ধই শিশুর সামাজিক যোগাযোগকে সহজতর করে তোলে।

একটি শিশু তার চারপাশের অচেনা জগৎ সম্পর্কে জানতে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের ইন্দ্রিয়গত সংকেত গ্রহণ করে। পিতার গন্ধ সেগুলোর মধ্যে মাত্র একটি। তবু বিজ্ঞানীদের মতে, শিশুদের প্রাথমিক বিকাশে পিতারা ঠিক কীভাবে এবং কতখানি প্রভাব ফেলেন, সে বিষয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে গবেষণার জন্য এটি একটি চমৎকার সূচনা। আপনি যখন আপনার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, তখন আপনার অজান্তেই আপনার গায়ের সুবাস তার ছোট্ট মস্তিষ্কে এক গভীর নিরাপত্তার চাদর বিছিয়ে দেয়!