কোরিয়ান ড্রামায় প্রতিশোধ ও অ্যাকশনের গল্প নতুন কিছু নয়, কিন্তু চরিত্র নির্মাণ এবং আবেগের গভীরতা সেই চেনা কাঠামোকেও নতুন মাত্রা দিতে পারে। ‘এজেন্ট কিম রিঅ্যাকটিভেটেড’ সেই পরিচিত ধারাকেই অনুসরণ করলেও দর্শককে ধরে রাখার কৌশল ভালোভাবে জানে। ১০ পর্বের এই অ্যাকশন-থ্রিলার সিরিজটি কেবল মারপিট আর প্রতিশোধের গল্প নয়; এর প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে মেয়েকে বাঁচাতে আত্মোৎসর্গ করতে প্রস্তুত এক বাবার অদম্য আবেগ। সিরিজটির প্রথম দুই পর্ব দারুণ ছন্দে এগিয়েছে, যেখানে চরিত্রগুলোকে বুঝে নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় দিয়ে গল্প ঢুকে পড়ে অ্যাকশনের জগতে। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বজুড়ে দর্শকদের মন জয় করেছে সিরিজটি এবং চলতি বছরের জনপ্রিয় কোরীয় নাটকের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র কিম দো-হিয়ন, যিনি সো জি-সুপ অভিনীত। একটি ব্যাংকের শান্ত-ভদ্র ব্যবস্থাপক হিসেবে পরিচিত এই একক বাবা স্ত্রীর মৃত্যুর পর কিশোরী মেয়ে মিন-জিকে (সো সু-মিন) একাই বড় করছেন। ঝামেলা এড়িয়ে চলা এই সাধারণ মানুষের অতীত কিন্তু অন্ধকারে ঢাকা। একসময় তিনি ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা, তবে প্রয়াত স্ত্রীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রেখে সেই জীবন ছেড়ে দিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সম্ভব হয় না। স্কুলে হয়রানির শিকার হওয়ার পর মিন-জিকে অপহরণ করে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের সাথে যুক্ত একটি অপরাধী চক্র। মেয়েকে উদ্ধারে গিয়ে দো-হিয়নকে আবার সেই পুরোনো জগতে ফিরে যেতে হয়, যেখান থেকে তিনি চিরতরে বিদায় নিতে চেয়েছিলেন। মেয়ের সন্ধানে দো-হিয়নের অভিযান নজরে আসে ন্যাশনাল স্পেশাল মিশনস ব্যুরোর। একই সময়ে তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতাধর ব্যবসায়ী জু কাং-চান (জু সাং-উক) এবং উত্তর কোরিয়ার এজেন্ট কাং সিয়ং (কিম সিয়ং-গিউ)।

তবে এ লড়াইয়ে দো-হিয়ন একা নন। তার সাথে যোগ দেন দুই প্রাক্তন সহকর্মী—কৌশলী ও দ্রুতগতির সিয়ং হান-সু (চোই দে-হুন) এবং শক্তিতে ভরসা করা পার্ক জিন-চল (ইউন কিয়ং-হো)। তিনজনের ভিন্ন ভিন্ন দক্ষতা মিলে একটি বৈচিত্র্যময় দল গঠিত হয়, যাদের একটাই লক্ষ্য—মিন-জিকে ফিরিয়ে আনা। তাদের পথে যে বাধাই আসুক না কেন, তা পেরিয়ে যেতেই হবে। পরিচালনায় ছিলেন ই সুং-ইয়ং ও লি সো-ইয়ুন।

কয়েক বছর সিনেমায় ব্যস্ত থাকার পর ছোট পর্দায় ফিরেছেন সো জি-সুপ। কিম দো-হিয়ন চরিত্রে তিনি এতটাই স্বাচ্ছন্দ্যময় যে মনে হবে না তিনি দীর্ঘদিন দূরে ছিলেন। একদিকে সাধারণ একক বাবার দুর্বলতা, অন্যদিকে প্রাক্তন গোয়েন্দার নিখুঁত দক্ষতা—দুই সত্তার মধ্যে চমৎকার ভারসাম্য রেখেছেন তিনি। অ্যাকশন দৃশ্যেও তিনি দুর্দান্ত, মেয়েকে উদ্ধারে তিনি যেন একাই এক বাহিনী। চোই দে-হুন সিয়ং হান-সু চরিত্রে প্রাণবন্ততা ও সহজাত রসবোধ এনেছেন, অন্যদিকে ইউন কিয়ং-হোর পার্ক জিন-চল চরিত্রে দৃঢ়তা ফুটে ওঠে। এই দুই সহকর্মীর সাথে দো-হিয়নের কথাবার্তা ও সম্পর্ক গল্পে হালকা হাস্যরসের জন্ম দেয়, যা টানা অ্যাকশনের মাঝে দর্শককে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেয়। খলনায়ক হিসেবে জু সাং-উক যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য, তাকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ মনে হয়।

সিরিজটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি শুরুতেই অ্যাকশনে ঝাঁপিয়ে পড়েনি। প্রথমে দো-হিয়ন ও মিন-জির বাবা-মেয়ের সম্পর্ক বুঝতে দর্শককে সময় দেওয়া হয়েছে, যা এই বন্ধনকে বিশ্বাসযোগ্য করেছে। তাই মিন-জিকে অপহরণের পর দর্শক আবেগগতভাবে দো-হিয়নের পাশে দাঁড়িয়ে যায়। একজন বাবা যখন মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে একের পর এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হচ্ছেন, তখন তার প্রতিটি আঘাতে ফুটে ওঠে শুধু অ্যাকশন নয়, পিতার মর্মন্তুদ উদ্বেগ। এই আবেগই লড়াইয়ের দৃশ্যগুলোকে আরও শক্তিশালী করেছে। তাছাড়া, তিন নায়কের ভিন্ন ভিন্ন লড়াইয়ের কৌশল—একজন শান্ত ও হিসাবি, অন্যজন গতি ও কৌশলে, আরেকজন শক্তির জোরে—প্রতিটি অ্যাকশন সিকোয়েন্সকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে, যা দর্শকের মধ্যে একঘেয়েমি তৈরি হতে দেয়নি।

যদিও প্রথম দুই পর্বের গতি প্রায় নিখুঁত, তবুও শুরুতে সিরিজটি একসাথে অনেকগুলো গল্প বলতে চেয়েছে। স্কুল বুলিং, দুর্নীতিগ্রস্ত করপোরেট জগৎ, গোয়েন্দা সংস্থা, আর উত্তর কোরিয়ার এজেন্ট—সবকিছু প্রথম দুই ঘণ্টার মধ্যেই উপস্থাপন করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এগুলো গল্পের সাথে যুক্ত হলেও, এতগুলো চরিত্র ও হুমকির আকস্মিক আবির্ভাব শুরুতে গল্পটিকে কিছুটা বিশৃঙ্খল মনে হতে পারে। ধীরে ধীরে এগোলে প্রতিটি স্তর দর্শকের কাছে আরও স্পষ্ট হতো। সবশেষে, কয়েকটি পর্ব ধরে তৈরি হওয়া উত্তেজনা ও রহস্যের সমাপ্তি কিছুটা তাড়াহুড়ো করে ফেলা হয়েছে। দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব এত দ্রুত শেষ হয়ে যায় যে কিছু আবেগঘন মুহূর্ত যথাযথ সময় পায় না। দো-হিয়ন ও তার মেয়ের সম্পর্ক এবং তিন বন্ধুর আরও কিছু শান্ত মুহূর্ত দেখানো গেলে সমাপ্তি আরও তৃপ্তিদায়ক হতো। তবুও, ‘টেকেন’ বা ‘নোবডি’ ধাঁচের ছবি পছন্দ করা দর্শকদের জন্য ‘এজেন্ট কিম রিঅ্যাকটিভেটেড’ একটি দারুণ পছন্দ হতে পারে, যেখানে চেনা গল্পের সাথে মিলবে দুর্দান্ত অ্যাকশন এবং অতিরিক্ত পাওনা হিসেবে বাবা-মেয়ের হৃদয়স্পর্শী আবেগ।