বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে যে কয়েকজন শিল্পী অমর হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে আবদুর রহমান বয়াতির নাম সবার আগে উচ্চারিত হয়। আজ বুধবার তাঁর ১৩তম প্রয়াণবার্ষিকী। ২০১৩ সালের ১৯ আগস্ট ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন এই মহান শিল্পী। তবে তাঁর গান, সুর ও পরিবেশনশৈলী আজও বাঙালির হৃদয়ে একই রকমভাবে জাগরূক।
ঢাকার সূত্রাপুরের দোলাইপাড়ে ১৯৩৯ সালে জন্ম নেওয়া আবদুর রহমান বয়াতি সংগীতের প্রতি ছিল অসাধারণ অনুরাগ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকেই তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন লোকসংগীতের সাধনায়। আলাউদ্দিন বয়াতি, কবি জসীমউদ্দীন এবং রজ্জব আলী বয়াতির সান্নিধ্যে এসে তাঁর সংগীত ভাবনা পরিণত হয়েছিল আরও গভীর থেকে গভীরতর।
শুধু গায়ক হিসেবে নয়, গীতিকার, সুরকার এবং বংশীবাদক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল সমানভাবে উজ্জ্বল। খঞ্জনি হাতে মঞ্চে শরীর দুলিয়ে যখন গান ধরতেন, তখন পুরো শ্রোতাসমাজ যেন স্তব্ধ হয়ে যেত। ‘মন আমার দেহঘড়ি সূক্ষ্ম তৈরি রুপার তারে’, ‘মা ফাতেমার কান্না’, ‘ছেড়ে দে নৌকা আমি যাব মদিনা’ কিংবা ‘আমি ভুলি ভুলি মনে করি’— এই গানগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। দেহতত্ত্বের কঠিন দর্শনকে তিনি এত সহজ ভাষায় উপস্থাপন করতেন যে সাধারণ মানুষও তা উপলব্ধি করতে পারত।
দেশ-বিদেশের বহু মঞ্চে তিনি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীতকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সামনে গান গেয়ে তিনি বাঙালি সংস্কৃতিকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। সংগীতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও তিনি দুই হাজারেরও বেশি গানের স্রষ্টা হিসেবে পরিচিত। তাঁর সৃষ্ট সেই গানগুলো আজও বাউল, মারফতি, মুর্শিদি এবং দেহতত্ত্বের ধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। মৃত্যুর পরেও তাঁর সুরের জাদু বাংলার প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে আছে— বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম কিংবা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও।




