মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক চাপ একজন নারীকে কী চরম পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে মেক্সিকোর এক ঘটনা। সন্তান ধারণ করতে না পারার ভয় আর স্বামীকে হারানোর আতঙ্কে এক নারী নিজের জীবনের ১৩ বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন। নেটফ্লিক্সের নতুন তথ্যচিত্র ‘আ চাইল্ড অব মাই ওন’-এ উঠে এসেছে সেই অন্ধকার অধ্যায়ের কাহিনি। গত ১৩ আগস্ট মুক্তি পাওয়া এই তথ্যচিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র এলেওর আলেহান্দ্রা মারিন মেন্দোজা, যিনি আলী নামে পরিচিত। ২০০৯ সালে মেক্সিকো সিটির একটি হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় তিনি এক নবজাতককে অপহরণ করেছিলেন। এর আগে তিনি পরিবার ও বন্ধুদের বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে তিনি অন্তঃসত্ত্বা। আলীর দাবি, শিশুটির মা স্বেচ্ছায় সন্তানটি তাকে দিয়েছিলেন; কিন্তু শিশুটির মা মায়রা নাভারো সেই দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। আদালতের নথিও আলীর দাবির সত্যতা খুঁজে পায়নি। তথ্যচিত্রটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর নির্মাণশৈলী। প্রথম ৫০ মিনিটে ঘটনাটিকে সিনেমার আদলে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে পেশাদার অভিনয়শিল্পীরা আলীর বর্ণনা অনুযায়ী ঘটনা ফুটিয়ে তুলেছেন। এরপর পর্দায় আসেন প্রকৃত আলী, মায়রা, আলীর প্রাক্তন সঙ্গী আর্তুরো গারমিনো এবং মামলার বিচারক তাইসিয়া ক্রুজ পারসেরো। এই কাঠামো দর্শককে আলীর নিজের তৈরি বাস্তবতা এবং আদালতের প্রতিষ্ঠিত সত্যের মধ্যে দোলাচলে ফেলে দেয়। আলীর গল্পের শুরুটা অপরাধ দিয়ে নয়, বরং সন্তানহীনতার যন্ত্রণা দিয়ে। স্বামী আর্তুরোর সঙ্গে সম্পর্কে সন্তান নেওয়ার প্রবল ইচ্ছা ছিল, কিন্তু তিনবার গর্ভপাতের পর তাদের স্বপ্ন ভেঙে যায়। আর্তুরো দত্তক নিতে রাজি ছিলেন না বলে দাবি আলীর। ফলে সন্তান জন্ম দেওয়ার চাপ ক্রমেই বাড়তে থাকে। নিজের ওপর সেই চাপ এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে তিনি একটি কাল্পনিক গর্ভধারণের গল্প তৈরি করেন। হাসপাতালে কাজের সুবাদে তিনি ভুয়া আলট্রাসনোগ্রামের নথি তৈরি করেন এবং প্রচুর জাঙ্ক ফুড খেয়ে শরীরে গর্ভধারণের আকার আনতে চেষ্টা করেন। এমনকি তার বেবি শাওয়ারও আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে উপহার খোলা ও পেটে হাত বোলানোর দৃশ্য ভিডিওতে ধারণ হয়। প্রকৃত ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মায়রা বলেন, সন্তান জন্ম দেওয়ার পর আলী নিজেকে হাসপাতাল কর্মী পরিচয় দিয়ে তার কক্ষে এসেছিলেন এবং একটি জরিপের কথা বলেছিলেন। এরপর মায়রাকে বাথরুমে যেতে বলা হলে ফিরে এসে তিনি দেখেন তার সন্তান নেই। তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন, কোনো নার্স শিশুটিকে নিয়ে গেছেন। তদন্তে দেখা যায়, আলীর দাবিকৃত সময়ে মায়রা ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নেননি, বরং অন্য একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত চেকআপ করাতেন। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, আলী খালি একটি শপিং ব্যাগ নিয়ে হাসপাতালে ঢোকেন এবং কয়েক ঘণ্টা পর সেই ব্যাগসহ বেরিয়ে যান। গ্রেপ্তারের পর আলীর স্বামী আর্তুরোও আটক হন, তবে তিনি খালাস পান। আদালত মনে করে, আর্তুরো বিশ্বাস করতেন আলী সত্যিই তার সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। আলীকে ১৩ বছরের বেশি কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২৬ বছর বয়সে কারাগারে ঢোকা আলী ৩৯ বছর বয়সে মুক্তি পান। ২০২৩ সালে মুক্তির পর তিনি নতুন জীবন শুরু করতে চেয়েছিলেন এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি আর কখনো সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। তার উপলব্ধি, মা হওয়ার আকাঙ্ক্ষার একটি বড় অংশ ছিল অন্যদের খুশি করার ইচ্ছা। তবে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেও তার জীবনে সেই পুরোনো চাপ ফিরে আসে। আর্তুরো আবারও সন্তান নেওয়ার কথা বলেন এবং আলী রাজি না হওয়ায় তিনি অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। সেই সম্পর্কে তার সন্তানও হয়। আলী শেষ পর্যন্ত আর্তুরোর সেই সন্তানের সঙ্গে সহমাতৃত্বের সম্পর্ক তৈরি করেন। পরিচালক মাইতে আলবেরদি ২০২২ সালে কারাগারে আলীর সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি মনে করেন, আলী নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য একটি ‘রূপকথা’ তৈরি করেছেন, যেখানে শিশুটির মা তাকে সন্তানটি দিয়েছিলেন। এই উপলব্ধি থেকেই তথ্যচিত্রের অভিনব নির্মাণশৈলী। আলবেরদি প্রশ্ন তুলেছেন, একজন নারীকে মা হওয়ার জন্য সমাজ কতটা চাপ দেয় এবং একজন অপরাধী তার অপরাধের কথা বলার সময় কতটুকু সত্য বলেন, আর কতটুকু আত্মরক্ষার কৌশল। তথ্যচিত্রটি শুধু একটি শিশু চুরির গল্প নয়; এটি মাতৃত্বের সামাজিক চাপ, সন্তানহীনতার ভয়, দাম্পত্য সম্পর্ক এবং অপরাধবোধের জটিল চিত্র। আলী তার অপরাধ স্বীকার করেছেন, কিন্তু তার নিজের বয়ানে শিশুটির মা সম্মতি দিয়েছিলেন—এই দুই সত্যের সংঘর্ষই তথ্যচিত্রটিকে অস্বস্তিকর ও গভীর করে তুলেছে। টাইম অবলম্বনে।
মাতৃত্বের চাপ থেকে নবজাতক চুরি: নেটফ্লিক্সের নতুন তথ্যচিত্রে মেক্সিকোর আলীর অবিশ্বাস্য ঘটনা
মেক্সিকোর আলী মেন্দোজা মা হওয়ার সামাজিক চাপে ভুয়া গর্ভধারণের নাটক সাজিয়ে হাসপাতাল থেকে এক নবজাতক চুরি করেন। ১৩ বছরের বেশি কারাভোগের পর মুক্তি পান। নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র 'আ চাইল্ড অব মাই ওন'-এ তার ঘটনা ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তুলে ধরা হয়েছে।




