শিল্প যে কেবল নান্দনিকতার বিষয় নয়, বরং ভিন্ন ভূগোল, ইতিহাস ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে — তারই জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত ‘ব্রিজিং হরাইজনস: আ ভিজ্যুয়াল ডায়ালগ অব নেচার, হেরিটেজ অ্যান্ড ইনোভেশন’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি। প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও নবচিন্তার এই সম্মিলনে একই ক্যানভাসে ধরা পড়েছে দুই দেশের শিল্পীদের ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি।

প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ হলো এই ভিন্নতা — সিঙ্গাপুরের শিল্পকর্মে যেখানে বারবার ফিরে এসেছে নগরায়ন, স্থাপত্যের জাঁকজমক, নদী ও সামুদ্রিক জীবনের ছোঁয়া, সেখানে বাংলাদেশের শিল্পীদের ক্যানভাসে প্রাধান্য পেয়েছে নদী, গ্রামীণ জীবন, লোকজ ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও অস্তিত্বের নানা প্রশ্ন। প্রথম দর্শনে এই বৈপরীত্য দর্শকদের নজর কাড়লেও গভীরে গেলে একটি সীমাবদ্ধতাও চোখে পড়ে। বাংলাদেশকে যদি শুধুমাত্র গ্রামীণ ও লোকজ সংস্কৃতির প্রতীক আর সিঙ্গাপুরকে কেবল আধুনিকতার মানদণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে দুই দেশের সমসাময়িক বাস্তবতার জটিল বহুমাত্রিকতা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে এই সরলীকরণকে অনেকাংশে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা। রফিকুন নবী, মোহাম্মদ ইউনুস, জামাল আহমেদ, আজহারুল ইসলাম শেখ, হারুন অর রশীদ টুটুল ও সৌরভ চৌধুরীর কাজের বিষয়বস্তুর বিস্তৃতি প্রশংসনীয় — লোকজীবনের সরল রূপ থেকে শুরু করে নগর সভ্যতার জটিলতা, সামাজিক বাস্তবতা থেকে অস্তিত্বের দার্শনিক প্রশ্ন — সবকিছুই যেন ধরা পড়েছে তাদের শিল্পভাবনায়। ফলে বাংলাদেশের শিল্প এখানে একক কোনো পরিচয়ে আবদ্ধ হয়ে থাকেনি, বরং তার অন্তর্নিহিত বৈচিত্র্য ও গভীরতাই প্রকট হয়েছে।

অন্যদিকে, তরুণ শিল্পীদের কাজে দেখা যায় ভিন্ন এক মাত্রা। নকশিকাঁথা, আলপনা, জামদানি, টেপা পুতুল, বাউলের গান — এমনকি সিঙ্গাপুরের মার্লিয়ন, ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য, পোশাক ও সমুদ্র-বাণিজ্যের অনুষঙ্গ — এই সব পরিচিত প্রতীককে পাশাপাশি বসিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু শিল্প-সমালোচনার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন থেকে যায় — পরিচিত প্রতীকগুলোর পাশাপাশি স্থাপন কি সত্যিই গভীর শিল্প-সংলাপ তৈরি করতে পারে? কোনো কোনো কাজে প্রতীকগুলো নতুন অর্থ সৃষ্টি করলেও অনেক ক্ষেত্রে তা নিছক পরিচয় উপস্থাপনের সরল চিত্রভাষায় পর্যবসিত হয়েছে। ‘সংলাপ’ এবং ‘পাশাপাশি অবস্থান’ — এই দুইয়ের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্যটিই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতা — নাকি ঐতিহ্যের ভেতরেই আধুনিকতার সন্ধান? প্রদর্শনীর তরুণ শিল্পীদের কাজ দেখতে গিয়ে এই প্রশ্নটি বারবার সামনে এসেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশের তরুণ শিল্পীদের অনেকেই ঐতিহ্যের উপাদানগুলোকে কেবল অতীতের স্মারক হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং সেগুলোকে সমকালীন শিল্পের সক্রিয় ও প্রাণবন্ত উপাদানে রূপান্তরিত করেছেন। এই প্রবণতা অবশ্যই ভবিষ্যতের জন্য সম্ভাবনাময়। তবে সাফল্যের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও চোখে পড়ে — অনেক কাজে প্রতীকগুলো বর্ণনাধর্মী বা চিত্রণধর্মী হয়ে উঠেছে, যেখানে তারা নিজস্ব পরিচিত অর্থের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো ব্যঞ্জনা তৈরি করতে পারেনি।

এই প্রসঙ্গে অনিন্দ্য নাহার হাবিবের ‘রঙের নৃত্য’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি নকশিকাঁথার মোটিফকে নিছক ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে আটকে রাখেননি; রং, আকার ও বিন্যাসের মাধ্যমেই তাকে সমকালীন শিল্পভাষায় রূপ দিয়েছেন, যেখানে সংস্কৃতি, পুরাণ ও রঙের খেলা একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে। একইভাবে, আজহারুল ইসলাম শেখের মৃৎশিল্পে দেখা যায় স্বতন্ত্র এক আধুনিকতা। বিভিন্ন প্রতীককে কীভাবে সরলীকরণের মাধ্যমে নকশা ও শিল্পনন্দনে উপস্থাপন করা যায়, তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। বাস্তবানুগ বর্ণনার বাইরে গিয়ে বিষয়ানুভূতির সারল্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি খুঁজে পেয়েছেন নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য। সৌরভ চৌধুরীর উপস্থাপনাতেও অনুরূপ বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।

শিল্পীর স্বাতন্ত্র্য, সহজাত করণকৌশল ও উপকরণ ব্যবহারের দক্ষতায় কারু তিতাসের কাজ শিল্পের অভিজ্ঞতাকে রসময় করে তুলেছে, আর আহমদ শামসুদ্দোহা যেন রূপ ও ভাবনার বিকাশকে দুলিয়েছেন মনোরাজ্যের দোলনায়। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুরের শিল্পীদের একটি বড় অংশের কাজে দৃশ্যনির্ভরতা ও ঐতিহ্যনির্ভর চিত্রভাষা প্রকট। তবে অং কিম সেং-এর ‘বিবি বাবা হাউস’-এ দৃশ্যের বর্ণনার ভেতরেও এক ধরনের স্বতন্ত্র আধুনিকতার অনুভূতি পাওয়া যায়।

প্রদর্শনীটির কাঠামোতে মূলত তিনটি দিগন্তের সমন্বয় ঘটেছে। প্রথম দিগন্তে রয়েছেন সিঙ্গাপুরের শিল্পীরা, যাদের কাজ বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে সিঙ্গাপুরকে শুধু আধুনিক নগররাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং তার ঐতিহ্য, প্রকৃতি, স্থাপত্য, নদী, সামুদ্রিক জীবন ও বহুসাংস্কৃতিক স্মৃতির মধ্য দিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে। দ্বিতীয় দিগন্তে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের কাজ, যেখানে কিউরেটর হারুন অর রশীদ টুটুলের নির্বাচনে বাংলাদেশের স্থান, কাল, মানুষ, প্রকৃতি ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির স্বতন্ত্র পরিচয় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে — ফলে বাংলাদেশের শিল্প এখানে কোনো একমাত্রিক ‘লোকজ’ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তার ভেতরে বহুমাত্রিক জীবন ও সময়ের উপস্থিতি প্রকট।

প্রদর্শনীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ভবিষ্যৎ-মুখী দিকটি অবশ্যই তৃতীয় দিগন্ত — তরুণ শিল্পীদের অংশগ্রহণ। উন্মুক্ত আহ্বান ও কিউরেটরিয়াল নির্বাচনের মাধ্যমে ১২ জন তরুণ শিল্পীর কাজ এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে, যাদের মধ্যে ছয়জন গ্রান্ট বিজয়ী। বাংলাদেশের তরুণ শিল্পীদের জন্য এটি সত্যিই এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি।

ঢাকার সিঙ্গাপুরের হাইকমিশনের উদ্যোগে, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকার সহযোগিতায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক হারুন অর রশীদ টুটুলের কিউরেটরিয়াল পরিকল্পনায় আয়োজিত এই প্রদর্শনীটি শুধু শিল্পকর্মের সমাবেশ নয়; এটি সাংস্কৃতিক কূটনীতি, শিল্প আদান-প্রদান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পচর্চাকে একই পরিসরে যুক্ত করার একটি সম্মিলিত প্রয়াস। প্রদর্শনীটি গত ১৪ আগস্ট শুরু হয়ে আগামী ১৯ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদিন দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে।