ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের কাছেই আনিয়ের-সুর-সেন শহরে অবস্থিত লুই ভুইতোঁ পরিবারের ঐতিহাসিক বাড়িটি এখনো দর্শনার্থীদের বিস্মিত করে। বিশ্বের অন্যতম বিলাসবহুল ফ্যাশন হাউস লুই ভুইতোঁর উত্থানের পেছনে এই স্থানের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ব্র্যান্ডটি প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পর, ১৮৫৯ সালে, ফরাসি নকশাবিদ ও উদ্যোক্তা লুই ভুইতোঁ আনিয়েরে প্রায় ৪৫ হাজার বর্গফুট জমি ক্রয় করেন এবং সে সময়ের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি কারখানা নির্মাণ করেন। ধাতব খুঁটি ও বিম দিয়ে তৈরি সেই ভবনটি ছিল সে সময়ের স্থাপত্যে এক যুগান্তকারী সংযোজন। এখানে তৈরি অসাধারণ কারুশিল্পের ট্রাঙ্ক ও ব্যাগ লুই ভুইতোঁকে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি এনে দেয়।

প্রথমদিকে বাড়িটির নিচতলায় কারখানা এবং ওপরে লুই ভুইতোঁ পরিবারের বসবাসের ব্যবস্থা ছিল। ১৮৬৯ সালে ভুইতোঁ পরিবারের স্থায়ী আবাসনের জন্য পাশে আলাদা একটি বাড়ি নির্মাণ করা হয়। ১৬৭ বছর পরেও আনিয়েরের এই বাড়ি প্রাণবন্ত। বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা এখানে সব সময় বসবাস না করলেও সপ্তাহান্তে তাঁরা এখানে আসেন, থাকেন এবং কারখানায় সময় কাটান। বাড়িটির পাশে অবস্থিত কারখানাটি এখনো সচল রয়েছে এবং সেখানে বিশেষ বেসপোক ট্রাঙ্কগুলো শতভাগ হাতে তৈরি হয়।

বাড়িটির একটি অংশে গ্যালারি তৈরি করা হয়েছে, যেখানে লুই ভুইতোঁর শুরুর দিকের ১৮৭৪ সালের পণ্য এবং অতি দুর্লভ ট্রাঙ্কের ছবি সংরক্ষিত রয়েছে। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত আনিয়েরের কারখানাই ছিল লুই ভুইতোঁর একমাত্র উৎপাদনকেন্দ্র। এই ঐতিহাসিক স্থানের গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, প্যারিসের প্রধান কার্যালয়ে যোগ দেওয়া প্রত্যেক নতুন কর্মীকে এখনো ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এখানে নিয়ে আসা হয়। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা গুরুত্বপূর্ণ অতিথি ও ভিআইপি গ্রাহকদেরও নিয়মিত এই বাড়ি ঘুরিয়ে দেখানো হয়।

বিলাসিতার চেয়ে আরাম ও পারিবারিক উষ্ণতাকে গুরুত্ব দিতেন লুই ভুইতোঁ। তাই বাড়ির অভ্যন্তর এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে যেকেউ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তবে ১৮৯২ সালে লুই ভুইতোঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে জর্জ ভুইতোঁ ও জর্জের স্ত্রী জোসেফিন বাড়িটিকে আরও জাঁকজমকপূর্ণ করে তোলেন। তাঁরা এখানে আর্ট নুভো ধারার সাজসজ্জা যুক্ত করেন। জোসেফিনই ছিলেন ভুইতোঁ পরিবারের শেষ সদস্য, যিনি পুরো সময় এই বাড়িতে বসবাস করেছেন। তিনি প্রতিদিন খুব ভোরে উঠে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কারখানার প্রত্যেক কর্মীকে শুভেচ্ছা জানাতেন।

১৯৬৪ সালে ১০৩ বছর বয়সে জোসেফিনের মৃত্যুর পর বাড়ির আসবাব উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। এরপর কিছু সময়ের জন্য বাড়িটি গুদাম ও অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জোসেফিনের শততম জন্মদিন উদযাপনের স্মৃতি এখনো উজ্জ্বল। লুই ভুইতোঁর প্রপৌত্র প্যাট্রিক লুই ভুইতোঁ বলেন, সেদিন প্রায় ৩০০ অতিথি এসেছিলেন। সবাইকে একসঙ্গে জায়গা দেওয়া সম্ভব ছিল না, তাই উৎসব চলে দিনজুড়ে। সে সময় বাড়ির সাজসজ্জাও ছিল চোখে পড়ার মতো এবং সবুজ লনে টেবিল পেতে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

আশির দশকের মাঝামাঝি বাড়িটি সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ধীরে ধীরে এটি আগের চেহারা ফিরে পায়। বাড়ির নিচতলা থেকে প্রদর্শনী কক্ষ সরিয়ে পাশের ভবনে নেওয়া হয়। সেখানে ১৮৬৫ সালের একটি গম্বুজ আকৃতির ট্রাঙ্ক থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের নানা ব্যাগ, ট্রাঙ্ক ও নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। বসবাসের বাড়িটির দেয়ালে ফুলের নকশার অলংকরণ ও কারুকাজ রয়েছে। বসার ঘরের কেন্দ্রে একটি সেলাডন-সবুজ রঙের ফায়ারপ্লেস আছে, তবে সেটি শুরুতে ছিল না। আসল ফায়ারপ্লেসটি সংস্কারের সময় বিশেষভাবে সিল করা বাক্সে সংরক্ষণ করা হলেও পরে রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যায়।

১৮৯০-এর দশকে তৈরি রঙিন কাচের (স্টেইনড গ্লাস) জানালাগুলো এখনো অক্ষত, যেখানে আইরিস, পপি, ক্রিস্যানথেমাম, ক্লেমাটিসসহ বিভিন্ন ফুল ও লতার নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। জর্জ ভুইতোঁর সময় এসব জানালায় কিছু ছোট স্বচ্ছ অংশও ছিল, যার মাধ্যমে তিনি পাশের কারখানায় কী কাজ চলছে তা গোপনে নজর রাখতেন—অনেকটা আধুনিক সিসি ক্যামেরার মতো।

আনিয়েরের এই বাড়ি ‘মেজঁ লুই ভুইতোঁ’ নামে পরিচিত। লুই ভুইতোঁ পরিবারের ষষ্ঠ প্রজন্মের সদস্য এবং ব্র্যান্ডটির বর্তমান হেড অব সাভোয়া-ফেয়ার (কারুশিল্প ও ঐতিহ্যের সুরক্ষা) পিয়ের লুই ভুইতোঁ এ বাড়িতে ছোটবেলায় বেশ কিছু বছর কাটিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন আলোচনায় সেই শৈশবের স্মৃতি তুলে ধরেছেন। বাড়ি আর কারখানা যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত, তেমন পরিবেশেই প্রথম ১০ বছর কেটেছে পিয়েরের। এই বাড়িটি এখনো লুই ভুইতোঁ পরিবারের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।