স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সাম্প্রতিক মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে দেশের ২৫টি আদিবাসী ছাত্র, যুব, নারী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। যৌথ এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, আদিবাসী ইস্যুতে মন্ত্রীদ্বয়ের এ বক্তব্য ইতিহাস ও বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল এবং এটি অত্যন্ত আপত্তিকর। একইসাথে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ চার দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে।
গত মঙ্গলবার রাজধানীর ঢাকায় চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিএইচটিআরএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে ওই বক্তব্য দেন মন্ত্রীরা। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিকের মূল পরিচয় বাংলাদেশি; এখানে কেউ আদিবাসী নয়। তার মতে, ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘আদিবাসী’ বলতে আলাদা কোনো গোষ্ঠী নেই। অন্যদিকে তথ্যমন্ত্রী স্বপন বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ পরিভাষাটি মোটেই প্রাসঙ্গিক নয়।
সংগঠনগুলো তাদের বিবৃতিতে দুই মন্ত্রীর এমন অবস্থান দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ মূলত বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ দেশ। মূলধারার বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি দেশের নানা প্রান্তে ৫০টিরও বেশি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা নিয়ে টিকে আছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে আদিবাসী জনগণের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
তবে স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এসে আদিবাসীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে বলেও বিবৃতিতে অভিযোগ আনা হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠী আজ নিজেদের জাতীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গভীর সংকটে পড়েছে বলে মনে করছে সংগঠনগুলো।
বিবৃতিতে উত্থাপিত চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে — বাংলাদেশের আদিবাসীদের সংবিধানে ‘আদিবাসী’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান; আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ তাদের ভূমি, ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা; নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ, সুরক্ষা ও বিকাশের নিশ্চয়তা; এবং জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র (২০০৭) বাস্তবায়ন করা।
যে ২৫টি সংগঠন এই যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে, তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিল, ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফোরাম, বম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ম্রো স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ খুমী স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ খেয়াং স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন (বাগাছাস), বাংলাদেশ গারো স্টুডেন্ট ফেডারেশন, বাংলাদেশ হাজং ছাত্র সংগঠন, বাংলাদেশ মাহাতো আদিবাসী ছাত্র সংগঠন, হাজং স্টুডেন্ট কাউন্সিল, বাংলাদেশ গারো স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, খাসিয়া স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ, আরফি জাহাঙ্গীরনগর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম্ম শিক্ষার্থী পরিবার, ইন্ডিজিনাস স্টুডেন্টস ইউনিয়ন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিজিনাস স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন এবং অ্যাসোশিয়েশন অব ইন্ডিজিনাস স্টুডেন্টস।




