ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হঠাৎ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েছেন জেলার মানুষ। বুধবার গভীর রাত থেকে সরাইল উপজেলায় গ্যাস প্রবাহ বন্ধের পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই সংকট ছড়িয়ে পড়ে জেলার অন্যান্য এলাকায়। বাসাবাড়িতে চুলায় আগুন জ্বালানো তো দূরের কথা, সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাস না থাকায় বন্ধ হয়ে যায় যানবাহনের জ্বালানি সরবরাহ।
এ অবস্থায় ক্ষুব্ধ হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকেরা। বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে সরাইল উপজেলা সদরের কুট্টাপাড়া এলাকার একটি সিএনজি স্টেশনের সামনে তারা জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধ করেন। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে হাইওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অবরোধকারীদের সরে যেতে বাধ্য করে।
সরাইল খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার পরিদর্শক (অপারেশন) আবদুল হালিম জানান, গ্যাস না পেয়ে কয়েকজন চালক মহাসড়কে ইট-পাটকেল ফেলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছিল। পুলিশ গিয়ে তাদের ধাওয়া করে সরিয়ে দিয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সদর উপজেলার কিছু অংশসহ সরাইলে বুধবার রাতেই কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটার দিকে সাময়িকভাবে গ্যাস এলেও কিছুক্ষণ পর আবারও সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অসংখ্য বাড়িতে রান্নাবান্না সম্ভব হয়নি। কেউ কেউ মাটির চুলায় রান্নার ব্যবস্থা করেছেন, আবার অনেকে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেয়েছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজের প্রভাষক হাসনা হেনা জানান, সকাল থেকে তার বাসায় গ্যাস আসেনি। শহরের পৈরতলা এলাকার এই বাসিন্দা বলেন, দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরও গ্যাস না পাওয়ায় হোটেল থেকে খাবার কিনে এনেছেন তিনি। শহরের টেংকেরপাড় এলাকায় এক নারীকে বাড়ির উঠানে মাটির চুলায় রান্না করতে দেখা যায়।
সরাইল উপজেলার কুট্টাপাড়ার বাসিন্দা বশিরুল ইসলাম বলেন, সকাল থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত গ্যাসের কোনো সরবরাহ ছিল না। চারটার দিকে সামান্য গ্যাস এলেও চাপ খুবই কম ছিল এবং কিছুক্ষণ পরই আবার বন্ধ হয়ে যায়।
জানা গেছে, প্রায় এক বছর ধরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন রাত ১১টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকে। এর বাইরেও দিনের বিভিন্ন সময়ে গ্যাসের চাপ কম থাকে। তবে বৃহস্পতিবার একেবারেই গ্যাস না পাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। শহরের কান্দিপাড়ার বাসিন্দা আকলিমা বেগম জানান, সকাল থেকে চুলায় আগুন ধরাতে পারেননি তিনি। ছেলেরা দোকান থেকে রুটি কিনে খেয়েছে। এভাবে চললে কীভাবে বাঁচবো — প্রশ্ন তার।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকেরা গ্যাসের অজুহাতে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শহরের মেড্ডা এলাকার বাসিন্দা শংকর দাস জরুরি কাজে আশুগঞ্জের কামাউড়া গিয়েছিলেন। তিনি জানান, কুমারশীল মোড় থেকে সরাইল বিশ্বরোড পর্যন্ত স্বাভাবিক ভাড়া জনপ্রতি ৫০ টাকা হলেও আজ তাকে ৭০ টাকা দিতে হয়েছে। যাওয়া-আসায় অতিরিক্ত ৪০ টাকা খরচ হয়েছে। অটোরিকশাচালক রাসেল মিয়ার দাবি, সিএনজি স্টেশনে গ্যাস না থাকায় বেশি ভাড়া নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় মোট আবাসিক গ্যাস গ্রাহক ২৩ হাজার ১৭৮ জন এবং ক্ষুদ্র, কুটিরশিল্প, রেস্তোরাঁসহ বাণিজ্যিক গ্রাহক ১৬১ জন। জেলার দৈনিক গ্যাস চাহিদা পাঁচ থেকে ছয় মিলিয়ন ঘনফুট। শীতকালে গড়ে সাড়ে ৯ মিলিয়ন ঘনফুট এবং গরমকালে সাড়ে আট মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
বাখরাবাদ গ্যাসের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপমহাব্যবস্থাপক শফিকুল হক জানান, এলএনজি-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে বুধবার থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সরবরাহ ও চাপ কমেছে। এলএনজির রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে এই সমস্যা কবে সমাধান হবে তা তিনি জানেন না।




