একাত্তরের রক্তঝরা ইতিহাস ও বিজয়ের গৌরবময় মুহূর্তগুলো এবার নিবিড়ভাবে দেখার সুযোগ পাবে নতুন প্রজন্ম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার কামাউরা এলাকায় নির্মিত ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর পর এটি খুলে দেওয়া হলো।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে ৩ দশমিক ৬১ একর জমিতে স্থাপিত এই স্মৃতিস্তম্ভে মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনা ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আত্মত্যাগের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ২০১৭ সালে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার প্রকল্পটি হাতে নিলেও শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ কোটি টাকা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় একাধিক দফায় মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হয়, তখন ক্ষমতায় ছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে উদ্বোধনের পর দীর্ঘদিন ধরে এটি সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ ছিল, যা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছিল।

১৯৭১ সালের নভেম্বরে গঠিত মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ডের অধীনে ১৬ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেন ভারতীয় সৈন্যরা। এই যুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ সারাদেশে প্রায় ১ হাজার ৬৬১ জন ভারতীয় সৈন্য প্রাণ হারান। তাঁদের স্মরণেই ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ নির্মিত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মহাসড়ক থেকেই দৃষ্টি কাড়ে স্থাপনাটি। প্রবেশের দুটি ফটক পেরিয়ে ভেতরে গেলে পশ্চিমাংশের দেওয়ালে মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের চিত্র খোদাই করা। সেখানে সিকান্দার আবু জাফরের কবিতার লাইন ‘আমার কাঁধেই নিলাম তুলে তোমার যত বোঝা...’ লেখা। এছাড়া ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম’, ‘জয় বাংলা’ ও ‘এ মৈত্রী চিরদিন অটুট থাকবে’ জাতীয় শ্লোগানও স্থান পেয়েছে।

দক্ষিণ দিকের পার্কের পশ্চিমাংশে ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন, কারাগারের বন্দিদশা, ১৯৬২ সালের স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের প্রতিবাদসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক মুহূর্তের ছবি টেরাকোটায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পূর্ব পাশে অস্ত্র হাতে মিত্রবাহিনী, হেলিকপ্টার-যুদ্ধবিমান-ট্যাংকসহ মুক্তিযোদ্ধাদের নানা চিত্র রয়েছে। মূল স্মৃতিস্তম্ভের নিচে ব্রোঞ্জে খোদাই করা আছে মুক্তিযুদ্ধে নিহত ১ হাজার ৪৮২ জন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্য, ইস্টার্ন থিয়েটার সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ২৯ জন, বিমানবাহিনীর ১১ জন, নৌবাহিনীর ৬ জন, ৭৯ জন কর্মকর্তা ও জেসিও পর্যায়ের ৭০ জনের নাম।

স্থাপনাটির ভেতরে রয়েছে পানির ফোয়ারা, ফুড কোর্ট, রেস্টুরেন্ট, জাদুঘর ও শিশুদের জন্য পার্ক। ব্রাহ্মণবাড়িয়া গণপূর্ত বিভাগ ২০২৪ সালে এটি আশুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করে। রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় আট লাখ টাকা খরচ হয়। জেলা প্রশাসক বলেন, ধুলাবালি ও নানা কারণে স্থাপনাটি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এটি খুলে দেওয়া হয়েছে। প্রবেশমূল্য ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে ইজারা দিয়ে বা প্রশাসন নিজেই এর রক্ষণাবেক্ষণ করবে।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার সময় স্থাপনাটির সৌন্দর্য ও পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ধুলাবালি ও আশপাশের চাতালকলের কালো ধোঁয়ায় মলিন হয়ে পড়েছিল পরিবেশ। বছরখানেক আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চাতালকল সরানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্য সচিব আবুল হাশেম আজাদ বলেন, মিত্রবাহিনীর দেড় হাজারের বেশি সদস্য ভুল তথ্যে অ্যাম্বুশের শিকার হয়ে নিহত হয়েছিলেন; নতুন প্রজন্ম এই স্থাপনা দেখে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে। তবে চাতালকলের কারণে স্মৃতিস্তম্ভটি পরিষ্কার রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।