দেশে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান গ্যাস সংকট আরও গভীর হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সামিট গ্রুপের ভাসমান টার্মিনাল থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে গ্যাসের যোগান আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনকেও চরমভাবে ব্যাহত করছে। বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতির কারণে ইতোমধ্যে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র লোডশেডিং চলছে, আর এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে রাজধানীও।
জ্বালানি বিভাগ এবং পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মজুত যাতে শেষ না হয়ে যায় সেজন্য সোমবার সন্ধ্যা থেকেই সামিটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। সোমবার তা ২০ কোটি ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়। এরপর বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত ১০ কোটি ঘনফুট হারে সরবরাহ চলছিল। শেষ পর্যন্ত বিকেল ৫টার দিকে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে বন্ধ রয়েছে। ওই টার্মিনালের ৬০ কোটি ঘনফুট সক্ষমতার বিপরীতে এখন একটি বয়লার মেরামতের পর ৬ আগস্ট থেকে আংশিক সরবরাহ শুরু হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত দ্বিতীয় বয়লারটি চালুর আগে পরীক্ষার জন্য আবারও পুরো টার্মিনালটি ৭২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখার পরিকল্পনা চলছে, যদিও সুনির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সামিটের টার্মিনালটির সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট। এক্সিলারেট বন্ধ থাকায় শুরুর দিকে প্রতিদিন ৫৬ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করেছিল সামিট। কিন্তু বঙ্গোপসাগরে আসা নতুন এলএনজি জাহাজ থেকে সমুদ্রে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে টার্মিনালে গ্যাস স্থানান্তর সম্ভব না হওয়ায় সোমবার রাত থেকে সরবরাহ কমানো শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে সার্বিকভাবে এলএনজি থেকে এখন মাত্র ৩০ কোটি ঘনফুটের কম গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যা দেশের মোট চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। বর্তমানে দেশে গ্যাসের মোট সরবরাহ ১৯৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে, অথচ দৈনিক চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণ সংস্থা তিতাসের সরবরাহ ১০০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে, যা স্বাভাবিক সময়ে ১৫৫ কোটি ঘনফুটের বেশি থাকে। গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানা, রান্নার চুলা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন—সব খাতেই সংকট প্রকট হয়েছে। যানবাহনে সিএনজি পেতেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।
সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। বিপণিবিতান ও দোকানপাটের নতুন খোলার সময়সূচি (বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা) এবং রাত ৭টার মধ্যে আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধের নির্দেশনা ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ অগ্রাধিকার দিতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, গ্রামের মানুষের ভোগান্তি লাঘবের জন্যই ঢাকায় সীমিত আকারে লোডশেডিং করা হচ্ছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী শুক্রবার রাতের মধ্যে সমুদ্র স্বাভাবিক হলে শনিবার ভোর থেকে জাহাজ থেকে টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তর শুরু হবে এবং দুপুরের পর থেকে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে রোববার থেকে বিদ্যুৎ-জ্বালানি পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা ডিপিডিসি ও ডেসকোর তথ্যানুযায়ী, বুধবার রাত ১১টা থেকে রাজধানীতে লোডশেডিং শুরু হয়েছে। ডিপিডিসির এক কর্মকর্তা জানান, রাত ১১টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৫০ মেগাওয়াট, সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২০০ মেগাওয়াট এবং দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হবে। তবে কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা লোডশেডিং হবে বলেও তিনি জানান। রাতে পান্থপথ, যাত্রাবাড়ী, রাজাবাজার, লালমাটিয়া, মণিপুরি পাড়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকার বাসিন্দারা এই লোডশেডিংয়ের অভিযোগ করেছেন।




