সৌদি আরবের পাহাড়ি শহর তাইফ শুধু ভ্রমণের গন্তব্য নয়, এটি হৃদয়েরও এক গন্তব্য। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, শীতল আবহাওয়া, ফলের বাগান এবং ইসলামের ইতিহাসের এক বেদনাময় অথচ মহিমান্বিত অধ্যায়—সব মিলিয়ে তাইফ যেন সময় ও অনুভূতির এক অপূর্ব সংযোগস্থল। সম্প্রতি সেখানে ভ্রমণে গিয়ে এক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন মক্কায় বসবাসরত এক প্রবাসী লেখক। মক্কা থেকে তাইফের পথে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি মহাসড়ক, গভীর খাদ ও আকাশছোঁয়া পর্বতমালা চোখে পড়ে। প্রকৌশলের অসাধারণ নকশায় নির্মিত এই সড়ক যেন সৌদি আরবের আরেক বিস্ময়। পথে দেখা মেলে বন্য বানরের দল, যারা পথিকদের কাছ থেকে খাবার নিতে অভ্যস্ত। এই দৃশ্য মানুষ ও প্রকৃতির সহজ-সরল সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাইফ শহরে পৌঁছে মেলে এক ভিন্ন পরিবেশ। মরুভূমির বুকে সবুজ দ্বীপের মতো এই শহরটি গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হিসেবে পরিচিত। শীতল বাতাস, পাহাড়ঘেরা উপত্যকা ও ফলের বাগান এখানকার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে তাইফের সবচেয়ে বড় পরিচয় ইসলামের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। চৌদ্দশত বছরেরও বেশি আগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের দাওয়াত নিয়ে এই শহরে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁকে উপহাস ও পাথর নিক্ষেপের শিকার হতে হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি আশ্রয় নেন উতবা ও শায়বা ইবনে রাবিয়ার আঙুরবাগানে। আজও সেই বাগানের নীরবতা ইতিহাসের সেই করুণ মুহূর্তকে ধরে রেখেছে। বাগানের ভেতরে অবস্থিত ছোট মসজিদে নামাজ আদায়ের সময় মনে হয়, এই মাটিতেই নবী (সা.) তাঁর হৃদয়ের আর্তি আল্লাহর দরবারে নিবেদন করেছিলেন। স্থানীয় গাইডের কাছ থেকে জানা যায়, একটি পুরোনো বাড়ি ‘বুড়ির বাড়ি’ নামে পরিচিত, যা নিয়ে নানা লোককথা প্রচলিত। তাইফ সফরের আরেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মসজিদ ও সমাধিস্থল। কোরআনের তাফসিরে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়। মসজিদের প্রশান্ত পরিবেশ জ্ঞানের আলোর প্রতিচ্ছবি বহন করে। এর সামনে রয়েছে সারি সারি রেস্তোরাঁ, কফিশপ ও স্যুভেনিরের দোকান। পর্যটকেরা এখানে আতর, তাসবিহ, খেজুর, ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি ও তাইফের বিখ্যাত গোলাপের সুগন্ধি কিনে নিয়ে যান। তাইফের কেবল কারে চড়ে পাহাড়ের ওপর দিয়ে ভ্রমণ এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা দেয়। নিচে বিস্তীর্ণ উপত্যকা, ফলের বাগান ও দূরের শহর দেখে মনে হয় আকাশ থেকে পৃথিবীকে নতুন করে দেখা। ফলের রাজধানী হিসেবে তাইফে আঙুর, ডালিম, ডুমুর, পীচ, এপ্রিকট, নাশপাতি ও স্ট্রবেরি জন্মায়। বিশ্বখ্যাত তাইফের গোলাপ থেকে তৈরি আতর ও গোলাপজল রপ্তানি হয় বহু দেশে। পাহাড়ি বাতাসে গোলাপের হালকা সুবাস ভেসে বেড়ায়, যা শহরকে স্বতন্ত্র করে তোলে। বিদায়ের সময় বিকেলের শেষ আলো পাহাড়ের গায়ে সোনালি আভা ছড়িয়ে দেয়। ফেরার পথে কারনুল মানাযিল মিকাতে থামা হয়, সেখানে ইহরাম বেঁধে মক্কার পথ ধরা হয়। রাতের পবিত্র কাবাঘর, তাওয়াফ ও ওমরাহ সম্পন্নের প্রশান্তি তাইফ সফরের পূর্ণতা এনে দেয়। এই ভ্রমণ লেখককে শিখিয়েছে—কষ্টের চেয়ে বড় ধৈর্য, প্রতিশোধের চেয়ে বড় ক্ষমা এবং মহানবী (সা.)-এর আদর্শের মহিমা। তাইফ কেবল একটি পাহাড়ি শহর নয়, এটি ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়, যেখানে প্রতিটি পাহাড় ধৈর্যের গল্প বলে, প্রতিটি বাতাস ক্ষমার বাণী বহন করে।
তাইফ: ইতিহাস ও প্রকৃতির অপূর্ব মিলনস্থল, নবীর ধৈর্যের সাক্ষী পাহাড়ি শহর
সৌদি আরবের পাহাড়ি শহর তাইফে ভ্রমণে বেরিয়ে লেখক মুগ্ধ প্রকৃতির সৌন্দর্য ও ইসলামের ইতিহাসের মিশেলে। বিশ্বনবীর ধৈর্যের স্মৃতি বহনকারী আঙুরবাগান, সাহাবি ইবনে আব্বাসের মসজিদ ও তাইফের বিখ্যাত গোলাপের সুবাস ভ্রমণকে করেছে আত্মিক।




