নিত্যদিনের আপাত নগণ্য কিছু ভ্রান্তির কারণেই হেপাটাইটিসের মতো প্রাণঘাতী অসুখে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ হেপাটোলজি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও বারডেম জেনারেল হাসপাতালের লিভার ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. গোলাম আযম এক সাক্ষাৎকারে এই হুঁশিয়ারি দেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, নানবিধ উপায়ে ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিসের জীবাণু সংবাহিত হয়। হেপাটাইটিস বি, সি ও ডি ভাইরাস প্রধানত দেহতরল এবং সংক্রমিত রক্তের মাধ্যমেই ছড়ায়। অপরদিকে হেপাটাইটিস এ দানা বাঁধে দূষিত খাদ্য ও পানির মাধ্যমে, আর হেপাটাইটিস ই-ও ছড়ায় কলুষিত পানির বাহনে।
বিশেষজ্ঞ জানান, যেসব অঞ্চলে হেপাটাইটিস বি-র প্রাদুর্ভাব প্রবল, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ আক্রা পাঁচ বছর বয়সের নিচের শিশুদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। সাধারণত মায়ের গর্ভ থেকে সন্তানের দেহে এই রোগ সংক্রমিত হয় অথবা খোলা ক্ষতস্থানের মাধ্যমেও এটি এক শরীর থেকে অন্য শিমরে যেতে পারে। অধ্যাপক আযদ জোর দিয়ে বলেন, অনিরাপদ ইনজেকশন ও চিকিৎসাবিধি, এবং সঠিকভাবে পরীক্ষা ছাড়া রক্ত পরিবর্তনই হল এই সংক্রমণের পেছনে মুখ্য কারণ। একই ছুঁচ ও সিরিঞ্জ শেয়ারের কারণে মাদক ব্যবহারকারী সম্প্রদায়ে এরা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সেলুন বা বিউটি পারলারকেও তিনি দায়িমুক্ত করেননি। কাঁচি, রেজর বা চুল তুলার জন্য ব্যবহৃত ধারালো উপকরণ পুনরায় ব্যবহার করলে হেপাটাইটিস বি ও সি-র জীবাণু ছড়াতে পারে, বিশেষত ত্বকে কোনো চিরা বা ক্ষত থাকলে। এইজন্য এসব স্থানে একবার ব্যবহারযোগ্য তথা ডিসপোসেবল উপকরণের ব্যবহার নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
বিবাহপূর্ব স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রসঙ্গেও মত দেন বিশেষজ্ঞ। তিনি স্পষ্ট করে জানান, কেবল বিবাহ নয়, যেকোনো ব্যাক্তিরই হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা করানো উচিত যারা টিকা পাননি। ফলাফল নেগেটিভ এলে দেরি না করে ভ্যাক্সিন নেওয়া প্রয়োজন। বিবাহের আগে এ পরীক্ষা করাটা একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের কর্তব্য বলে তিনি মন্তব্য করেন। কোনো ব্যক্তির দেহে জীবাণু শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ভাইরাসের তীব্রতা মাপা জরুরি। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সঙ্গীরও পরীক্ষা ও টিকা প্রদান নিশ্চিত করতে বলা হয়। তবে হেপাটাইটিস সি-র কোনো কার্যকরী প্রতিষেধক এখনো তৈরি হয়নি।
হেপাটাইটিসের ভয়াবহ জটিলতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, এর সকল প্রকারই তীব্র লিভার প্রদাহ ঘটাতে সক্ষম। কিন্তু বি, সি ও ডি ভাইরাস দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণেও রূপ নেয়। বিশেষ করে শৈশবে আক্রান্ত হলে এই স্থায়ী রূপ নেওয়ার ঝুঁকি ৯৫% পর্যন্ত। এসব দীর্ঘমেয়াদী সংক্রমণ লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের অনুঘটক। বৈশ্বিক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখেরও অধিক লোক এ রোগের জটিলতায় অকালে মারা যান, যার পুরোটা প্রতিরোধযোগ্য ও নিরাময়যোগ্য। শুধুমাত্র হেপাটাইটিস বি ও সি-র কারণে এই মৃত্যুর ৯৫% ঘটে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, হেপাটাইটিস বি-জনিত সিরোসিস ও ক্যানসারে প্রায় ১১ লাখ মানুষ প্রাণ হারান। একই বছরে হেপাটাইটিস সি-র কারণে মৃত্যু হয় আনুমানিক ২ লাখ ৪০ হাজার জনের।
চিকিৎসার প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৯০ দশক থেকে হেপাটাইটিস বি-র জন্য ৯৫% কার্যকরী টিকা এবং অ্যান্টিভাইরাল থেরাপি রয়েছে। আবার ২০১৫ সাল থেকে হেপাটাইটিস সি-র জন্য মাত্র ১২ সপ্তাহের অ্যান্টিভাইরাল কোর্সেই প্রায় ৯৫% নিরাময় ঘটানো সম্ভব হচ্ছে। বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ও এর টিকা আবিষ্কারক নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক স্যামুয়েল ব্লুমবার্গের জন্মদিন স্মরণীয় করে রাখতেই ২৮ জুলাই দিনটি বেছে নেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান উদ্বৃত করে তিনি জানান, ২০২৪ সালে বিশ্বে ২৪ কোটি লোক দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত ছিলেন, অথচ ৫%ও চিকিৎসা পাননি। একই সময়ে চিহ্নিত ১ কোটি ১০ লাখ হেপাটাইটিস সি রোগী এখনও চিকিৎসার আওতার বাইরে। তিনি শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে নতুন সংক্রমণ প্রতিরোধকেই মুখ্য হিসেবে চিহ্নিত করে মা থেকে শিশুর সংক্রমণ রোধে গর্ভবতী নারীর জন্য অ্যান্টিভাইরাল ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরামর্শ দেন।




