পৃথিবীতে প্রাণহানির সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক কৌশল নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিলিপ প্লেইটের বই 'ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!' অবলম্বনে বিজ্ঞানচিন্তায় প্রকাশিত ধারাবাহিক নিবন্ধের অষ্টম পর্বে আলোচনা করা হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বি৬১২ ফাউন্ডেশনকে কেন্দ্র করে লেখাটিতে গ্রহাণু ও ধূমকেতুর আঘাত থেকে মানবজাতিকে বাঁচানোর উপায় তুলে ধরা হয়। নাসার সাবেক নভোচারী এড লু ও রাস্টি শোয়েকার্ট ২০০২ সালে এই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে পঞ্চাশের কাছাকাছি সদস্য নিয়ে সংস্থাটি মহাজাগতিক বস্তুর আঘাত প্রতিরোধে বিজ্ঞানসম্মত কৌশল খুঁজছে।

প্রতিরোধের একটি কৌশল হলো গ্রহাণুর পৃষ্ঠে রকেট অবতরণ করিয়ে নিয়মিত ইঞ্জিন চালু করা। তবে এই পদ্ধতি কার্যকর করতে হলে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হবে। গ্রহাণুর পৃষ্ঠ অমসৃণ বা গুঁড়ো হতে পারে, যা অবতরণকে বিপজ্জনক করে তোলে। অধিকন্তু, নিজ অক্ষের ওপর ঘূর্ণায়মান গ্রহাণুতে একটানা ইঞ্জিন চালালে কোনো কাজ হবে না; কক্ষপথ পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট দিকে ধাক্কা দেওয়া জরুরি। ছোট ও অনিয়মিত আকৃতির গ্রহাণুতে বিশৃঙ্খল ঘূর্ণনের সম্ভাবনা বেশি, তবে এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েকশ’ গ্রহাণুতে এমন ঘূর্ণন শনাক্ত হয়েছে।

এসব জটিলতা এড়াতে বি৬১২ ফাউন্ডেশন গ্র্যাভিটি ট্রাক্টর নামে একটি ভিন্ন কৌশল প্রস্তাব করেছে। এতে রকেটকে গ্রহাণুর খুব কাছে ভাসমান অবস্থায় রাখা হয়, সরাসরি সংস্পর্শে না এনে। মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে ধীরে ধীরে গ্রহাণুটিকে টেনে কক্ষপথ পরিবর্তন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় বিস্ফোরণের ঝামেলা না থাকলেও সফলতার জন্য ১০ থেকে ২০ বছর সময় প্রয়োজন। গ্রহাণুর ভরের তুলনায় রকেটের ভর অনেক কম হলেও ক্রমাগত পাল্টা ধাক্কা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে গ্রহাণুর গতিবেগে সামান্য পরিবর্তন আনা সম্ভব, যা পৃথিবী থেকে দূরে সরানোর জন্য যথেষ্ট হবে। সফলতার জন্য ইঞ্জিনের গ্যাস যেন গ্রহাণুর গায়ে না লাগে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

এই কৌশলের আরও উন্নত সংস্করণের নাম এনহ্যান্সড গ্র্যাভিটি ট্রাক্টর। এতে রোবোটিক আর্ম ব্যবহার করে স্বয়ং লক্ষ্যবস্তু গ্রহাণুর বুক থেকে পাথর সংগ্রহ করে নভোযানের ভর বাড়ানো হয়। মাত্র কয়েক টন পাথরের কারণে গ্রহাণুকে ৫০ গুণ বেশি শক্তিতে টানা সম্ভব হয়, যা মিশনের সময়সীমা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনে। নাসার অ্যাস্টেরয়েড রিডাইরেক্ট মিশনের আওতায় এই কৌশল হাতে-কলমে পরীক্ষার পরিকল্পনা থাকলেও ২০১৭ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন তা বাতিল করে দেয়। উচ্চ ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েনকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে একাধিক গ্র্যাভিটি ট্রাক্টরের যুগপৎ ব্যবহার বা অন্যান্য পদ্ধতির সঙ্গে সমন্বয়ের চিন্তা করছেন বিজ্ঞানীরা।

লেখাটিতে গ্রহাণুর তুলনায় ধূমকেতুকে অনেক বেশি অনিশ্চিত হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ধূমকেতু মূলত পাথর, ধূলিকণা ও বরফের তৈরি। সূর্যের কাছাকাছি এসে উত্তপ্ত হয়ে এদের পৃষ্ঠের বরফ সরাসরি গ্যাসে পরিণত হয় এবং প্রচণ্ড বেগে বেরিয়ে আসে। এই প্রক্রিয়া রকেট ইঞ্জিনের মতো কাজ করে, যা ধূমকেতুকে তার কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত করে। নিজ অক্ষের ওপর ঘূর্ণায়মান অবস্থায় এই ধাক্কা কোন দিকে পড়বে, তা আগাম অনুমান করা অসম্ভব। ফলে গ্রহাণুর মতো ধূমকেতুর গতিপথ ভবিষ্যদ্বাণী করা বা তাতে রকেট অবতরণ করানো কঠিন।

পর্যায়কালের ভিত্তিতে ধূমকেতুকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। স্বল্প পর্যায়কালের ধূমকেতু ২০০ বছরের কম সময়ে সূর্য প্রদক্ষিণ করে। এদের মধ্যে জুপিটার ফ্যামিলি কমেট ও হ্যালি-টাইপ কমেট নামে উপশ্রেণি রয়েছে। অন্যদিকে সৌরজগতের শেষ সীমানা ওর্ট ক্লাউড থেকে আসা দীর্ঘ পর্যায়কালের ধূমকেতুর সময়সীমা ২০০ বছর থেকে কয়েক লাখ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এদের কক্ষপথের নতি যেকোনো মানের হতে পারে, ফলে আকাশের যেকোনো দিক থেকে আগমন ঘটতে পারে। হেল-বপ ধূমকেতুর উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে যে, এটি পৃথিবীর পাশ দিয়ে যাওয়ার মাত্র দুই বছর আগে আবিষ্কৃত হয়েছিল। ২৫ মাইল ব্যাসের নিউক্লিয়াসবিশিষ্ট এই ধূমকেতু সরাসরি পৃথিবীর দিকে এলে চিক্সুলুব ইমপ্যাক্টরের আঘাতকেও ছাড়িয়ে যেত। তবে স্বস্তির খবর হলো, পৃথিবীতে ধূমকেতুর আঘাতের সম্ভাবনা মাত্র কয়েক শতাংশ।