ফুটবলের সর্ববৃহৎ আসর ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রযুক্তির ছোঁয়া আগের যেকোনোবারের চেয়ে বেশি। ৪৮ দলের এই টুর্নামেন্টে মাঠের খেলা নিখুঁত ও দ্রুততর করতে ফিফা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছে। শুরু থেকেই আলোচনায় সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি, যেখানে এআই নিজেই অফসাইড শনাক্ত করে মিলিসেকেন্ডের মধ্যে রেফারিকে জানিয়ে দেয়। আগের বিশ্বকাপে অফসাইড চেক করতে ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড লাগলেও এবার তা কমে এসেছে ক্ষণিকের ব্যবধানে। মাঠের চারপাশে বসানো ১২টি ক্যামেরা প্রতিটি খেলোয়াড়ের শরীরের ২৯টি বিন্দুর অবস্থান ট্র্যাক করে, আর বলের ভেতরের সেন্সর প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার তথ্য রেকর্ড করে। এআই সব তথ্য যাচাই করে সরাসরি লাইনসম্যানের কানে ও ভিডিও অপারেশন রুমে নির্দেশ পাঠায়। রেফারি চাইলে ভিএআর চেক করে সিদ্ধান্ত বদলাতে পারবেন, কিন্তু বর্তমানে সময়ক্ষেপণের প্রয়োজন নেই বললেই চলে।

খেলোয়াড়দের শারীরিক গঠনের সঠিক প্রতিনিধিত্ব করতে এবার প্রথমবারের মতো প্রতিটি ফুটবলারকে আলাদাভাবে ত্রিমাত্রিক স্ক্যান করা হচ্ছে। চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান লেনোভো প্রতিটি খেলোয়াড়কে ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ড স্ক্যান করে তাদের প্রকৃত অবয়ব তৈরি করছে। আগে সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তিতে একটি ধূসর মানব প্রতিমা ও জার্সি ব্যবহার করা হতো, যা সবার জন্য সমান ছিল। এবার থেকে খেলোয়াড়ের নিজস্ব উচ্চতা ও গঠন অনুযায়ী থ্রিডি মডেল তৈরি হবে, যাতে অফসাইডের মতো জটিল সিদ্ধান্ত আরও নির্ভুল হয়। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের প্রচলিত প্রযুক্তিতে ৩০টি ক্যামেরা ও ১০ হাজার ডেটা পয়েন্ট থাকলেও তা প্রতিটি খেলোয়াড়ের প্রকৃত গঠনের সাথে পুরোপুরি মেলে না, বিশেষ করে লাফিয়ে ওঠার সময়। লেনোভোর স্ক্যানিং প্রক্রিয়া সেই ঘাটতি দূর করবে।

একই প্রতিষ্ঠান ফিফার সাথে যৌথভাবে তৈরি করেছে 'ফুটবল এআই প্রো' নামে একটি অ্যাডভান্সড ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল। এটি চ্যাটজিপিটি বা কো-পাইলটের মতো কাজ করবে এবং প্রতিটি ম্যাচ ও খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সের গভীর বিশ্লেষণ দেবে। বিখ্যাত কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার কয়েক বছর ধরে লেনোভোর সাথে এই প্রযুক্তি তৈরিতে কাজ করেছেন। ফুটবল এআই প্রো ব্যবহার করে প্রতিটি দল নিজেদের ও প্রতিপক্ষের কৌশল বিশ্লেষণ করতে পারবে। বড় দলগুলোর কাছে যেমন অ্যানালিস্ট ও ডেটা বিশেষজ্ঞ থাকে, তেমনি ছোট দলগুলোর জন্যও সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে এই প্রযুক্তি। ফিফার পরিকল্পনা, ভবিষ্যতে সাধারণ দর্শকদের জন্যও এটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।

বল প্রযুক্তিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। অ্যাডিডাসের তৈরি অফিসিয়াল বল 'ত্রিওন্দা' মাত্র চারটি প্যানেল দিয়ে তৈরি, যা আগের বিশ্বকাপের আট প্যানেলের জাবুলানি বলের চেয়েও কম। জাবুলানি বলের মসৃণতার কারণে দূরপাল্লার শটে গতিপথ পরিবর্তন ও গতি দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার সমস্যা ছিল। ত্রিওন্দায় প্যানেলের খাঁজ খাঁজ নকশা মসৃণতা কমিয়ে দিয়েছে, ফলে বলের আচরণ স্বাভাবিক থাকবে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০ বছর ধরে বিশ্বকাপের বল নিয়ে গবেষণা করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। বলের ভেতরে থাকা 'কানেক্টেড বল' প্রযুক্তির সেন্সর (১৪ গ্রাম ওজনের চিপ) প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার কিক পয়েন্ট ও অবস্থান রেকর্ড করে। এই সেন্সর চালু রাখতে প্রতিটি বলকে ছয় ঘণ্টা চার্জ দিতে হবে, যা ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঘটছে। সেন্সরটি প্যানেলের সাথে আঠার মতো জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে এআই আরও নিখুঁতভাবে ডেটা প্রক্রিয়া করতে পারে।

রেফারির কাঁধে থাকা দায়িত্ব কমাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার। এবারের বিশ্বকাপে রেফারির বুকে বাটনে লাগানো ক্যামেরা থাকবে, যা পুলিশের ভেস্ট ক্যামেরার মতো পুরো ম্যাচের ফুটেজ ধারণ করবে। দর্শকেরা রেফারির চোখ দিয়ে খেলা দেখতে পাবেন এবং মাঠে কী কথাবার্তা হচ্ছে তাও শুনতে পারবেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ফুটেজকে স্ট্যাবিলাইজ করে দেখার উপযোগী করবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন লিগে ও ক্লাব বিশ্বকাপে পরীক্ষামূলকভাবে এটি ব্যবহারের সুফল মিলেছে। গোললাইন প্রযুক্তিও রয়েছে, যা ২০১০ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড-জার্মানি ম্যাচের কেলেঙ্কারির পর নিয়মিত হয়েছে। এবারো ১৪টি ক্যামেরা সেকেন্ডে ৫০০টি করে ছবি তুলে বলের অবস্থান শনাক্ত করবে। গোললাইনে থাকা ম্যাগনেটিক সেন্সর বলের চিপের সাথে সমন্বয় করে রেফারির স্মার্টওয়াচে 'গোল' বার্তা পাঠাবে।

তিন দেশের ১৬টি মাঠে ডিজিটাল টুইন সিস্টেম থাকবে, যা রিয়েল টাইমে দর্শক চলাচল, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য দেখাবে। সানডিস্কের হিসাব অনুযায়ী, এই বিশ্বকাপ থেকে ৯০ পেটাবাইটের বেশি তথ্য তৈরি হবে, যা কাতার বিশ্বকাপের চেয়ে ৪৫ গুণ বেশি। ব্যাংক অব আমেরিকার মতে, মোট ডেটার পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২ এক্সাবাইটে। ডেটাই এবারের বিশ্বকাপের প্রধান পণ্য বলে মন্তব্য করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সব মিলিয়ে মাঠের খেলার চেয়ে ডেটা নিয়েই হয়তো বেশি আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।