বন্য প্রাণীদের টিকে থাকার সংগ্রামে তাদের চোয়াল ও দাঁত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। বিবর্তনের ধারায় কিছু প্রাণী এতটাই শক্তিশালী চোয়ালের অধিকারী হয়েছে যে তারা পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ এবং হাঙর প্রজাতির মধ্যে এই শক্তি পরিমাপ করা হয়েছে নিউটন বা পাউন্ড এককে। কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে সরাসরি মাপা সম্ভব হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে এটি বিজ্ঞানীদের অনুমানের ওপর নির্ভরশীল।
আফ্রিকার সাব-সাহারান অঞ্চলে দেখা যায় দাগি হায়েনা, যাদের কামড়ের শক্তি প্রায় ৪ হাজার ৫০০ নিউটন। সাধারণত মৃতদেহখেকো হিসেবে পরিচিতি থাকলেও তারা দক্ষ শিকারী। শক্তিশালী চোয়াল দিয়ে জেব্রাসহ বড় প্রাণীর হাড় পর্যন্ত চিবিয়ে খেতে পারে এই প্রাণীটি। ঘণ্টায় ৬৫ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে সক্ষম হলেও বর্তমানে বন্য পরিবেশে প্রাপ্তবয়স্ক হায়েনার সংখ্যা মাত্র ১০ হাজারের কাছাকাছি। মানুষের হামলা ও বাসস্থান সংকটের কারণে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে।
ভালুক প্রজাতির মধ্যে মেরু ভালুকের কামড় সবচেয়ে শক্তিশালী বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এদের কামড়ের শক্তি ৫ হাজার নিউটন পর্যন্ত হতে পারে। পৃথিবীর বৃহত্তম ভালুক প্রজাতি হওয়ায় এরা সামুদ্রিক সিল শিকার করে, তবে চাইলে ওয়ালরাস বা বেলুগা তিমির মতো বড় প্রাণীও শিকার করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন ও বরফ গলে যাওয়ার কারণে মেরু ভালুক এখন বিলুপ্তির পথে।
তৃণভোজী হওয়া সত্ত্বেও গরিলার কামড় প্রাইমেটদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। গবেষণায় এদের কামড়ের শক্তি ৩ হাজার ৪২০ নিউটন পাওয়া গেছে। মানুষের সঙ্গে ডিএনএর ৯৮.৩ শতাংশ মিল থাকলেও শক্তির দিক থেকে তারা দশ গুণেরও বেশি শক্তিশালী। লম্বা ও ধারালো ছেদক দাঁত গাছের শক্ত ছাল চিবিয়ে খেতে সাহায্য করে। রোগ ও বাসস্থান ধ্বংসের কারণে গরিলাও বর্তমানে বিপন্ন।
বিড়াল প্রজাতির মধ্যে জাগুয়ারের কামড় দেহের আকারের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। ১ হাজার ২৫৪ নিউটন শক্তির এই কামড় শিকারের মাথার খুলি ফুটো করে দিতে পারে। সিংহ, বাঘ বা হায়েনার চেয়েও বেশি চাপ তৈরি করতে সক্ষম জাগুয়ার। তবে বর্তমানে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে।
স্থলভাগের প্রাণীদের মধ্যে জলহস্তীর কামড় সবচেয়ে শক্তিশালী, যার শক্তি প্রতি বর্গইঞ্চিতে ৮ হাজার ১৩০ নিউটন পর্যন্ত। শান্ত তৃণভোজী হলেও বিরক্ত করলে অত্যন্ত হিংস্র হয়ে ওঠে এই প্রাণীটি। সিংহ ও কুমিরের মতো শিকারিকেও সহজেই পরাস্ত করতে পারে জলহস্তী। এদের মুখের ভেতরের দাঁত ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, যার কারণে হাতির দাঁতের মতো এদেরও অবৈধ শিকার করা হয়। ২০০৬ সালে জলহস্তীকে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সমুদ্রের দুনিয়ায় শর্টফিন মাকো হাঙরের কামড় রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ হাজার নিউটন, যা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী হাঙরের কামড়। ২০২০ সালে নিউজিল্যান্ডের কাছে বিজ্ঞানীদের তৈরি বিশেষ যন্ত্রে এই তথ্য পাওয়া যায়। আকারে গ্রেট হোয়াইট হাঙরের চেয়ে ছোট হলেও এদের কামড়ের শক্তি বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। অন্যদিকে, গ্রেট হোয়াইট হাঙরের কামড় তাত্ত্বিকভাবে সব হাঙরের চেয়ে বেশি—১৮ হাজার নিউটন ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ডিজিটাল মডেলের তথ্য বলছে। তবে বাস্তবে সরাসরি মাপা এখনো সম্ভব হয়নি। পাখনা কাটা ও অবৈধ শিকারের কারণে এই দানবটি বিপন্ন।
সরীসৃপদের মধ্যে আমেরিকান অ্যালিগেটর ১৩ হাজার ১৭২ নিউটন শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। ২০০৬ সালের গবেষণায় এটি জীবিত প্রাণীর সর্বোচ্চ কামড়ের শক্তি হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল। তবে এদের মুখ খোলার পেশি দুর্বল হওয়ায় মানুষ হাত দিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে পারে।
সর্বোচ্চ শক্তির অধিকারী প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হয় লোনাপানির কুমির। ২০১২ সালের এক গবেষণায় এদের কামড়ের শক্তি রেকর্ড করা হয় ১৬ হাজার ৪১৪ নিউটন, যা যেকোনো প্রাণীর সরাসরি রেকর্ড করা সর্বোচ্চ। ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে এরা বাস করে। দাঁত দিয়ে চিবিয়ে না খেয়ে শিকারকে আস্ত গিলে ফেলে। মাছ, হাঙর, পাখি ও বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী এদের খাদ্যতালিকায় রয়েছে। ভারত ও ইন্দোনেশিয়ায় মানুষের ওপর আক্রমণের নজিরও রয়েছে।
সূত্র: ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার




