একটি দেশের বিমানবন্দরের অভ্যর্থনা ব্যবস্থা দেখে সে দেশের মানুষের স্বভাব সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা পাওয়া সম্ভব। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের রাজধানী ডেনপাসারের প্রধান বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সেখানকার কর্মীদের বিনয়ী ব্যবহার ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ দেখে প্রাথমিক ধারণাটিই ইতিবাচক হয়ে ওঠে। সরকারি পাসপোর্ট থাকায় ভিসার ঝামেলা ছিল না, তবে ইমিগ্রেশন এলাকায় যাত্রীদের জন্য তিনটি আলাদা লাইন ছিল—ভিসাধারী, আগমনী ভিসা গ্রহণকারী এবং কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী। এই সুব্যবস্থার কারণে ম্যানচেস্টার থেকে প্রায় ২২ ঘণ্টার দীর্ঘ বিমানযাত্রার ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। বিমানবন্দরে কাস্টমস ডিক্লারেশনের জন্য কিউআর কোড স্ক্যান করে ফরম পূরণ করতে হয়। আনুষ্ঠানিকতা শেষে মানি এক্সচেঞ্জে পাউন্ড বদলে ইন্দোনেশীয় রুপিয়াহ হাতে পেতেই এক অভূতপূর্ব অনুভূতি হয়—প্রতি পাউন্ডের বিনিময়ে ২৩ হাজার ২০০ রুপিয়াহ পাওয়ায় যাত্রী যেন মুহূর্তেই মিলিয়নিয়ার। তবে হোটেলে যাওয়ার জন্য অ্যাপ-ভিত্তিক ট্যাক্সির কথা না জেনে দর-কষাকষিতে অপটু হওয়ায় প্রায় দুই লাখ রুপিয়াহ অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে।
বালিতে পৌঁছেই বোঝা যায়, এখানকার অধিকাংশ মানুষ সনাতন ধর্মের অনুসারী। বিমানবন্দরে গণেশ, বিষ্ণু, গরুড় ও সরস্বতীর মূর্তি দেখে হিন্দু সংস্কৃতির শিকড়ের গভীরতা টের পাওয়া যায়। এমনকি রাস্তার পাশে মহাভারতের কৃষ্ণ ও অর্জুনের কথোপকথনের ভাস্কর্য দৃশ্যটি নজর কাড়ে। সকালে শহর ঘোরার সময় দেখা যায়, প্রতিটি বাড়ির সামনে নারীরা প্রার্থনা করে ভোগ নিবেদন করছেন। কোথাও আবার ঐতিহ্যবাহী পোশাকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সব বয়সী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ চোখে পড়ে। ১৯৯০-এর দশকে পর্যটনের বিকাশ ঘটলেও স্থানীয় জনগণ তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে রক্ষা করে চলেছেন।
ডেনপাসার শহর অত্যন্ত পরিপাটি ও শান্ত। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি গাছ, কোনো হর্নের কোলাহল বা ধুলাবালি নেই। পথে পথে চোখে পড়ে নানা প্রজাতির গাছের নার্সারি, যেখানে বনসাইয়ের সমাহার সবচেয়ে আকর্ষণীয়। শহরের এই পরিচ্ছন্ন রূপ ও পরিশীলিত রুচি দেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাভা-যাত্রীর পত্রের কথা মনে পড়ে যায়, যেখানে তিনি বালি দ্বীপের ছোট্ট আয়তনের মধ্যেই এক সুসজ্জিত সম্পূর্ণতার উল্লেখ করেছিলেন। ডেনপাসারের গভর্নর হাউস নামে একটি চমৎকার মনুমেন্টের আশপাশের খোলা জায়গায় স্থানীয় তরুণ-তরুণীরা ফুটবল ও ব্যাডমিন্টন খেলায় মেতে থাকে। লেখক ম্যানচেস্টার থেকে এসেছেন জানতে পেরে তরুণদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়—ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ম্যানচেস্টার সিটির মাঠ দেখেছেন কি না, তা জানতে আগ্রহী ছিলেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই এই দুই ক্লাবের অবস্থান শুনে তাদের আনন্দ আরও বেড়ে যায়, যা ফুটবলের সার্বজনীন আবেদনেরই প্রমাণ।
বালি সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইলেভেন্থ ওয়ার্ল্ড ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন কনফারেন্সে গবেষণাপত্র উপস্থাপন। ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার বিমানভাড়া ও হোটেল বুকিংয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ হয়। উপস্থাপনা শেষে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এক অধ্যাপক পিএইচডি শেষে পোস্টডক করার পরামর্শ দিলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়। সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বালির ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশিত হয়, যেখানে চোখ ও মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে আবেগ প্রকাশের ধরনটি ছিল স্বতন্ত্র—যা ধর্মীয় পরম্পরার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।




