ইসলামি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি মুসলমান নর-নারীর জন্য ন্যূনতম যে পরিমাণ ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা বাধ্যতামূলক, তা না জানলে বিশ্বাস ও কর্মের মৌলিক দায়িত্ব পালন করা দুরূহ। পারিভাষিক অর্থে ধর্মীয় জ্ঞানকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়: ‘ফরজে আইন’ বা ব্যক্তিগত আবশ্যকীয় জ্ঞান, যা শেখা প্রত্যেকের জন্য জরুরি; এবং ‘ফরজে কিফায়াহ’ বা সমষ্টিগত দায়িত্ব, যা কিছু মানুষ পালন করলে সমগ্র সম্প্রদায়ের ওপর থেকে দায়িত্ব সরে যায়।

আল্লামা ইবনুল কাইয়িম আল-জাওযিয়াহ (রহ.) এই ফরজে আইন জ্ঞানকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে চারটি মূল ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথম ভাগটি হলো ইমানের মূলনীতি সংক্রান্ত জ্ঞান। এতে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাবৃন্দ, নাজিলকৃত আসমানি কিতাব, সকল রাসুল এবং পরকালের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপনের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত। কোরআনের বর্ণনায় এই পাঁচটি বিষয়ের ওপর ঈমান আনা সৎকর্মশীল হওয়ার পূর্বশর্ত এবং এগুলো অস্বীকার করলে ব্যক্তি সুপথ থেকে বহু দূরে সরে যায় বলে উল্লেখ আছে। বিশুদ্ধ হাদিসেও জিবরাইল (আ.)-এর প্রশ্নের উত্তরে রাসুল (সা.) এই পাঁচটি বিষয়কেই ঈমানের পরিচয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাই এই নীতিগুলোর সঠিক জ্ঞান অর্জনের ওপরেই প্রকৃত ঈমান প্রতিষ্ঠা নির্ভর করে।

দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে ব্যবহারিক ইবাদতের বিধান সংক্রান্ত জ্ঞান। একজন বান্দার নিজের সম্পাদিত আমলগুলো যেমন অজু, পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাতের এবং এগুলোর সংশ্লিষ্ট খুঁটিনাটি শর্ত, রুকন এবং যেসব কারণে তা নষ্ট হয়ে যায়, সেসব সম্পর্কে জ্ঞান রাখা অত্যাবশ্যক।

তৃতীয় প্রকারটি হলো সেই সব চিরন্তন নিষিদ্ধ কাজের জ্ঞান, যা পূর্ববর্তী নবীদের বিধানেও হারাম ছিল এবং কোরআনের মাধ্যমে যার চূড়ান্ত তালিকা দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সুরা আরাফের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বোঝানো হয়েছে যে, অশ্লীলতা, পাপাচার, অনধিকার সীমালঙ্ঘন, কুফরি ও জুলুম এবং অজ্ঞাত বিষয়ে আল্লাহর নামে মিথ্যা আরোপ করা— এগুলো চিরকালীন হারাম। এসব কোনো অবস্থাতেই এবং কোনো ব্যক্তির জন্যই বৈধ নয়। এর বিপরীতে কিছু বিধান আছে যা পরিস্থিতি বিশেষে নিষিদ্ধ হলেও চরম প্রয়োজনে হালাল হয়ে যায়, সেসব এই চিরস্থায়ী তালিকার অংশ নয়।

চতুর্থ প্রকার হল সমাজে মানুষে-মানুষে পারস্পরিক আদান-প্রদান ও লেনদেনের বিধি সম্পর্কিত জ্ঞান। তবে এই জ্ঞানের বাধ্যবাধকতার স্তর মানুষের সামাজিক ভূমিকা ও অবস্থানের তারতম্যের কারণে আলাদা আলাদা হয়ে থাকে। একজন শাসকের প্রজার প্রতি দায়বদ্ধতা যেমন, একজন সাধারণ ব্যক্তির তার পরিবার ও প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব তেমন নয়। একইভাবে, যে ব্যক্তি নিয়মিতভাবে ব্যবসায়-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত, তার জন্য ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত নিয়মকান শেখা যতটা জরুরি, একজন সাধারণ ক্রেতার জন্য ততটা নয়। সব শেষে ইবনুল কাইয়িম মূল বিষয়টিকে তিনটি মূলনীতিতে সারসংক্ষেপ করেন: বিশ্বাসের জ্ঞান, কাজের জ্ঞান এবং বিরত থাকার জ্ঞান। আকিদার ক্ষেত্রে জ্ঞান হতে হবে সত্যের অনুগামী, কাজের ক্ষেত্রে জ্ঞানের উদ্দেশ্য হলো বাহ্য ও অভ্যন্তরীণ সকল কর্মকাণ্ড যাতে শরিয়তের নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন না করে এবং বিরতির জ্ঞান হলো, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পাপাচার থেকে দূরে থাকা এবং তাতে অটল থাকার কৌশল জানা।