প্রযুক্তির অগ্রগতি যোগাযোগকে করেছে সহজ, কিন্তু মানসিক দূরত্ব বাড়িয়েছে। ভার্চুয়াল বন্ধুত্বের এই যুগে অনেকের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃত বন্ধুত্বের আন্তরিকতা। সত্যিকারের বন্ধু সেই ব্যক্তি, যে কেবল ইহকালীন সাফল্য নয়, পরকালের সফলতাও কামনা করে। যে আমাদের ভুল ধরিয়ে দেয়, ভালো কাজে উৎসাহ দেয় এবং সর্বদা শুভাকাঙ্ক্ষী থাকে। ইসলামের দৃষ্টিতে এমন বন্ধু আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া এক অমূল্য নেয়ামত।
বন্ধু শুধু সময় কাটানোর সঙ্গী নয়; সে আমাদের চরিত্র, অভ্যাস, চিন্তাভাবনা এমনকি ঈমানকেও প্রভাবিত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর নির্দেশনায় স্পষ্ট, ‘মানুষ তার বন্ধুর ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ্য করে সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৩৩)। প্রখ্যাত তাবেয়ি আলকামা (রহ.) বলেছেন, ‘এমন ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্ব করো, যার সাহচর্যে তোমার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়; তুমি ভুল করলে সে সংশোধন করে এবং বিপদের দিনে তোমার পাশে দাঁড়ায়।’ সত্যিকারের বন্ধুর পরিচয় হলো সে আমাদের ভালো চায়, দুনিয়ার সাফল্যের পাশাপাশি আখেরাতের সফলতাও কামনা করে।
সৎ ও অসৎ সঙ্গীর পার্থক্য বোঝাতে রাসুল (সা.) একটি চমৎকার উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো আতর বিক্রেতা ও কামারের হাপরের মতো। আতর বিক্রেতার কাছ থেকে হয় আপনি সুগন্ধি কিনবেন, নতুবা অন্তত তার সুগন্ধি পাবেন। আর কামারের হাপর হয় আপনার পোশাক পুড়িয়ে দেবে, নতুবা তার দুর্গন্ধে আপনি কষ্ট পাবেন।’ (সহিহ বুখারি: ৫৫৩৪)।
যে বন্ধুত্ব শুধু দুনিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং পরকালেও বহাল থাকে, কুরআনে তার উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন বন্ধুরা একে অপরের শত্রু হয়ে যাবে; তবে মুত্তাকিরা ব্যতীত।’ (সুরা জুখরুফ: ৬৭)। দুনিয়ায় অনেক কারণে বন্ধুত্ব তৈরি হয়, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গড়ে ওঠা বন্ধুত্বের মূল্য আখিরাত পর্যন্ত বিস্তৃত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ কেয়ামতের দিন বলবেন, আমার সন্তুষ্টির জন্য যারা একে অপরকে ভালোবাসত, তারা কোথায়? আজ আমি তাদের আমার ছায়ায় স্থান দেব, যেদিন আমার ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৬)।
ভালোবাসা প্রকাশ করাও ইসলামের শিক্ষা। অনেক সময় আমরা ভাবি, মনের মধ্যে ভালোবাসা থাকলেই যথেষ্ট। কিন্তু রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যদি তার ভাইকে ভালোবাসে, তবে সে যেন তাকে তা জানিয়ে দেয়।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৫১২৪)। একটি আন্তরিক কথা, খোঁজ নেওয়া, দোয়া বা ভালো পরামর্শ বন্ধুত্বকে আরও গভীর করে।
বর্তমান সময়ে ভালো বন্ধু পাওয়া দুর্লভ। যদি এমন বন্ধু পাওয়া না যায়, তাহলে জ্ঞানীরা বলেন, ‘খারাপ সঙ্গের চেয়ে একাকিত্ব উত্তম। আর যদি ভালো বন্ধু না পাও, তবে নিজের উত্তম চরিত্রকেই নিজের সবচেয়ে কাছের সঙ্গী বানিয়ে নাও।’ বই, গাছ বা পছন্দের কোনো কাজ নিয়ে নিজের চারপাশে একটি জগৎ তৈরি করা যেতে পারে। তবে মানুষের কাছ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না হয়ে আল্লাহর কাছে এমন সঙ্গীর জন্য দোয়া করতে হবে, যে দুনিয়া ও আখিরাত দুই জীবনের জন্যই কল্যাণের কারণ হবে। কারণ, একজন ভালো বন্ধু অনেক সময় এমন পরিবর্তন এনে দিতে পারে, যা বছরের পর বছর একা চেষ্টা করেও সম্ভব হয় না।




