প্রকৃত সুখ ও মানসিক প্রশান্তির উৎস হিসেবে ইসলামে আল্লাহর ওপর ভরসা ও দোয়াকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানও মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনকে সুখের চাবিকাঠি বলে মনে করে। ইসলাম এই দুটি দিককেই দৈনন্দিন জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে চমৎকারভাবে সমন্বিত করেছে। মহানবী (সা.)-এর শেখানো তিনটি কালজয়ী জিকির ও দোয়া মুমিনের হৃদয়ে গভীর প্রশান্তি বয়ে আনে।

প্রথমত, আল্লাহর প্রতি নিখাদ সন্তুষ্টির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। আখেরাতে স্রষ্টার সাক্ষাৎই প্রকৃত সুখের চূড়ান্ত স্থান, তবে দুনিয়াতেও আত্মাকে শান্ত রাখার একটি অসাধারণ জিকির শিখিয়েছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। তিনি বলেছেন, কোনো মুসলিম সকাল-সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট দোয়াটি পড়লে কেয়ামতের দিন তার সন্তুষ্টি নিশ্চিত করা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ওয়াদা হয়ে যায় (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৮৭০)। দোয়াটি হলো—‘রাযীতু বিল্লাহি রব্বান, ওয়া বিল-ইসলামি দ্বীনান, ওয়া বি-মুহাম্মাদিন নাবিয়্যান।’ অর্থাৎ আল্লাহকে প্রতিপালক, ইসলামকে ধর্ম এবং মুহাম্মদকে নবী হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করেছি। প্রতিদিন এই বাক্যটি উচ্চারণের মাধ্যমে অন্তরে দৃঢ়তা আসে যে, আল্লাহ আমাদের হেদায়েত দিয়েছেন, রহমত বর্ষণ করেছেন—আমরা তাঁর সিদ্ধান্তেই পূর্ণ সন্তুষ্ট।

দ্বিতীয়ত, জীবনের যেকোনো সংকটে আল্লাহর ওপর পরম আস্থা রাখার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। প্রিয় নবী (সা.) ছোট-বড় সব বিপদে একটি বিশেষ জিকিরের পরামর্শ দিয়েছেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৫৬৩)। উচ্চারণ—‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল’। অর্থ—‘আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক’। চরম বিপদের মুহূর্তে এই দোয়া পড়ার অর্থ হলো নিজের জীবনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সর্বশক্তিমান আল্লাহর হাতে সঁপে দেওয়া। এই নিঃশর্ত সমর্পণের মাঝেই লুকিয়ে থাকে এক অসীম মানসিক স্বাধীনতা ও মুক্তি।

তৃতীয়ত, হৃদয়কে দ্বীনের ওপর স্থির রাখার আকুতি জানানোর কথা বলা হয়েছে। হতাশা ও বিষণ্ণতা মানুষকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে, শরীর হয়ে পড়ে অলস ও নিস্তেজ। এমন পরিস্থিতিতে ইমান ও আত্মিক শক্তিকে সজীব রাখা জরুরি। তাই মহানবী (সা.) প্রায়ই একটি দোয়া পাঠ করতেন (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৪০)। উচ্চারণ—‘ইয়া মুক্বাল্লিবাল ক্বুলূব, সাব্বিত ক্বালবী ‘আলা দীনিক’। অর্থ—‘হে অন্তরের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন’। আনাস (রা.) একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমরা আপনার ওপর ও আপনার আনা হেদায়েতের ওপর ইমান এনেছি, তবুও কি আপনি আমাদের নিয়ে ভয় পান?’ জবাবে নবীজি (সা.) বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, মানুষের অন্তর আল্লাহর দুটি আঙুলের মাঝে; তিনি যেভাবে চান তা ঘুরিয়ে দেন’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৪০)।