প্রতিদিন আট থেকে দশ ঘণ্টা ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতা, মেজাজ ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কারো সঙ্গে মতের অমিল থেকে প্রায়ই মনে মনে ক্ষোভ তৈরি হয়। এমন অবস্থায় কোনো মুহূর্তে মেজাজ হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা দেখা দিলে স্মরণ করা উচিত আল্লাহ আমাদের কাছে কেমন আচরণ আশা করেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ নবীজিকে লক্ষ্য করে বলেছেন, “আপনি ধৈর্য ধারণ করুন, আর আপনার ধৈর্য তো শুধু আল্লাহর সাহায্যেই সম্ভব। তাদের আচরণে কষ্ট পাবেন না এবং তাদের চক্রান্তের কারণে সংকুচিত বা উদ্বিগ্ন হবেন না।” (সুরা নাহল, আয়াত: ১২৭)।
ইসলাম জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, “ধৈর্যের চেয়ে বড় ও কল্যাণকর কোনো নেয়ামত কাউকে দেওয়া হয়নি।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৬৯)। নবীজির শেখানো সুন্নাহ অনুসরণ করে কীভাবে কর্মক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা যায় এবং মানসিক শান্তি বজায় রাখা যায়, তারই পাঁচটি কার্যকরী উপায় নিয়ে এই আলোচনা।
কর্মক্ষেত্রে সারাদিনের নানা ঝামেলার মাঝেও এমন কিছু বিষয় থাকে যা আনন্দ দেয়। কোনো ভালো সহকর্মীর সান্নিধ্য, চমৎকার কোনো প্রজেক্ট শেষ করার আনন্দ, বিকেলের এক কাপ চায়ের বিরতি কিংবা নতুন কিছু শেখার সুযোগ—অফিসের পরিবেশকে উপভোগ্য করে তোলে। হোদাইবিয়ার প্রান্তরে চরম অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার মুহূর্তে কোরাইশদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে সোহাইল ইবনে আমর আসছিলেন। তখন নবীজি (সা.) সোহাইল নামের ইতিবাচক অর্থের (সুহাইল অর্থ সহজ বা শিথিল) দিকে নজর দিয়ে সাহাবিদের আশ্বস্ত করে মুখে হাসি এনে বললেন, “আমাদের বিষয়টি এবার সহজ হয়ে গেল।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩১)। কাজের চাপ ও নেতিবাচক পরিস্থিতির মাঝেও ভালো দিক ও ক্ষুদ্র আনন্দগুলোকে সামনে রেখে মনকে প্রফুল্ল রাখা রাসুলের এই আচরণেরই প্রতিফলন। ইতিবাচক বিষয়গুলো নিয়ে ভাবলে মনের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমে যায়।
কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে বা কারো রুক্ষ কথায় হঠাৎ রাগ উঠলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখানো থেকে বিরত থাকা উচিত। এমন মুহূর্তে কিছুটা সময় নিয়ে ‘আউজুবিল্লাহ’ পড়া এবং অবস্থান পরিবর্তন করা ভালো। নবীজি বলেছেন, “তোমাদের কারও যখন রাগ আসে, সে যদি দাঁড়ানো অবস্থায় থাকে তবে যেন বসে পড়ে। এতে যদি তার রাগ চলে যায় তবে ভালো; অন্যথায় সে যেন শুয়ে পড়ে।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৮২)। রাগ একটি উত্তপ্ত মানসিক অবস্থা, তাই অবস্থান পরিবর্তন করলে ভঙ্গি বদলানোর প্রক্রিয়ায় মন কিছুটা সময় পায় এবং তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষতিকর কথা বা কাজ থেকে বিরত থাকা সহজ হয়।
কোনো সহকর্মী হঠাৎ রুক্ষ আচরণ করলে তার ওপর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষিপ্ত না হয়ে বিষয়টি অন্যভাবে দেখা উচিত। নিজেকে তার জায়গায় বসিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে—হতে পারে তিনি কোনো পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। নবীজি এক কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন এক নারী (সন্তান হারিয়ে) তীব্র শোকে কাঁদছিলেন। তিনি তাকে শান্ত করতে গিয়ে বললেন, “আল্লাহকে ভয় করো এবং ধৈর্য ধারণ করো।” নারীটি কর্কশ স্বরে বলে উঠল, “আমার কাছ থেকে দূরে থাকুন, আমার যে বিপদ হয়েছে, আপনার তো সেই বিপদ হয়নি!” নবীজি (সা.) নীরবে সেখান থেকে চলে এলেন। পরে নারীটি জানতে পারলেন ইনি আল্লাহর রাসুল, তখন তিনি অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চেয়ে বললেন, “আমি আপনাকে চিনতে পারিনি।” নবীজি শান্তভাবে বললেন, “ধৈর্য তো সেটাই, যা বিপদের প্রথম ধাক্কার সময় ধারণ করা হয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৮৩)। তাবেয়ি মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) বলেছেন, “যদি তোমার কোনো ভাই বা সহচর তোমার সঙ্গে অপছন্দনীয় কোনো আচরণ করে, তবে তার জন্য একটি কারণ (অজুহাত) খোঁজো। যদি কোনো কারণ খুঁজে না পাও, তবে মনে মনে বলো, তার নিশ্চয় এমন কোনো সংকট বা সমস্যা আছে, যা আমি জানি না।” (বাইহাকি, শুয়াবুল ইমান, হাদিস: ৭৮২৩)। মানুষের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে ছাড় দিতে পারলে নিজের মনও হালকা ও প্রশান্ত থাকে।
কর্মক্ষেত্রে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন কেউ ইচ্ছা করেই বা অসাবধানতাবশত আপনার আত্মসম্মানে আঘাত করতে পারে কিংবা অযাচিত যুক্তিতর্কে লিপ্ত হতে পারে। এ ধরনের উসকানিমূলক কথায় নিজের আবেগ প্রকাশ না করে মাথা ঠান্ডা রাখা জরুরি। একবার নবীজির উপস্থিতিতেই আবু বকরকে লক্ষ্য করে এক ব্যক্তি অপমানজনক কথা বলতে লাগল। আবু বকর (রা.) উত্তর না দিয়ে নীরব রইলেন। নবীজি তাঁর এই আত্মনিয়ন্ত্রণ দেখে মৃদু হাসছিলেন। লোকটি যখন থামল না, তখন আবু বকর ধৈর্য হারিয়ে লোকটির একটি কথার প্রতিউত্তর দিয়ে ফেললেন। সঙ্গে সঙ্গে নবীজি সেখান থেকে উঠে চলে গেলেন। পরে নবীজি (সা.) বললেন, “যতক্ষণ তুমি নীরব ছিলে, একজন ফেরেশতা তোমার পাশে থেকে তার জবাব দিচ্ছিল (তোমার সম্মান রক্ষা করছিল)। কিন্তু যখনই তুমি প্রতিউত্তর দিলে, তখন সেখানে শয়তান ঢুকে পড়ল। আর যেখানে শয়তান উপস্থিত হয়, আমি সেখানে বসতে পারি না।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৯৬)। তিনি আরও বলেছেন, “যে ব্যক্তি সত্য ও ন্যায়ের ওপর থাকা সত্ত্বেও (পরিস্থিতি শান্ত রাখতে ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে) বিতর্ক বা কথাকাটাকাটি পরিহার করে, আমি তার জন্য বেহেশতের প্রান্তে একটি প্রাসাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছি।” (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ১৯৯৩)। নবীজি নিজেকে সংবরণ করার তাগিদ দিয়ে বলেছেন, “সেই ব্যক্তি প্রকৃত বীর নয় যে কুস্তিতে অন্যকে আছাড় দেয়; বরং প্রকৃত বীর সে-ই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)।
উপরোক্ত কৌশলগুলো পালনের পাশাপাশি একজন মুমিন হিসেবে সহকর্মীদের সামনে সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপনের বিষয়টি মনে রাখা জরুরি। ইসলাম ক্ষমা, পরোপকার ও সহনশীলতাকে উৎসাহিত করে। অন্যের ভুলের ওপর ধৈর্য ধরলে এবং নম্র আচরণ করলে অন্যরাও আপনার কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠবে। নবীজি বলেছেন, “যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো ভালো কাজের সূচনা করবে (ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে), সে তার নিজের কাজের প্রতিদান পাবে এবং তার পরে যারা সেই অনুযায়ী ভালো কাজ করবে তাদের প্রতিদানও সে পাবে; এতে তাদের কারো সওয়াব থেকে বিন্দুমাত্র কমানো হবে না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৭)। নিজের আচরণ সংযত রাখার পাশাপাশি আল্লাহর সাহায্য কামনার বিষয়ে তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি সংযমী থাকার চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে সংযম দান করেন। আর যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণের আন্তরিক চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্যশীল হওয়ার শক্তি দান করেন। কোনো মানুষকে ধৈর্যের চেয়ে অধিক উত্তম ও প্রশস্ত আর কোনো নেয়ামত দেওয়া হয়নি।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৬৯)। কর্মক্ষেত্রে শত ব্যস্ততা ও নানা প্রতিকূলতার মাঝে ধৈর্যকে হাতিয়ার বানাতে পারলে শুধু সহকর্মীদের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয় না, বরং কাজের গতি ও নিজের মানসিক প্রশান্তি বহুগুণ বেড়ে যায়।




